জিরো পয়েন্ট নিউজ – সেখ নূরুল হুদা, ১৯ মার্চ ২০২৫ :
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা মঞ্চ ও সোমেন চন্দ স্মৃতি রক্ষা সমিতির সোমেন চন্দের ৮৪তম শহিদান দিবস পালন। গত ৮ই মার্চ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় সংহতি সংসদে, সোমেন চন্দ স্মৃতিরক্ষা সমিতি সর্বভারতীয় বাংলা ভাষা মঞ্চ ও ঐকতান গবেষণা পত্রের যৌথ উদ্যোগে পালিত হল বিপ্লবী সাহিত্যিক সোমেন চন্দের ৮৪তম শহিদান দিবস। অনুষ্ঠানের মুখ্য বক্তাছিলেন দৈনিক কালান্তর পত্রিকার সম্পাদক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সোমেন চন্দ স্মৃতি রক্ষা সমিতির সম্পাদক ও সোমেন গবেষক নীতীশ বিশ্বাস।

কল্যাণ বাবু তার বক্তব্যের শুরুতেই আজকের দিনে সোমেন চন্দকে স্মরণ করবার জন্য আয়োজকদের অশেষ ধন্যবাদ জানান। সোমেন চন্দের চরিত্রের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে বিশ্লেষণ মূলক আলোচনা উপস্থাপন করে বলেন সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করবার গুরুত্ব ইতিহাসে অনন্য। তিনি বলেন সোমেন চন্দ ছিলেন আসলে কালের স্বর্ণ ফসল। ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলনে সোমেনের ভূমিকা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান সময়ে যাত্রা করতে হবে।

তিনি তুলে ধরেন কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো সহ তথাকথিত অরাজনৈতিক বিপ্লবীরাই সেখানে মানুষের মঙ্গলে সাম্যবাদী আন্দোলনের নেতৃত্বে চলে আসেন,। সঠিক ও ন্যায়ের আন্দোলনের কোনো আলাদা কক্ষ থাকেনা, রাখা উচিতও নয়। তিনি দুই বাংলায় শহিদ শিল্পী সোমেন চন্দকে পতাকা করে মৌলবাদী ও ফ্যাসীবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ডাকদেন।

সভার অন্যতম বক্তা সাহিত্যিক অমিতাভ চক্রবর্তীর বক্তব্যে উঠে আসে রুশ বিপ্লবোত্তর উদ্দীপনাময় পরিস্থিতির কথা আর সেই পরিবেশ সাম্যবাদী সোমেন তথা এক আদর্শ কমিউনিস্ট শিল্পী সোমেন চন্দকে তিনি তার বিশ্লেষণে তুলে ধরেন। দৃষ্টান্ত দেন ‘ইদুর’ এবং ‘দাঙ্গা’ গল্পের ।

সভাপতি র বক্তব্যে নীতীশ বিশ্বাস তার দীর্ঘ বক্তব্যে বলেন সোমেন চন্দের সার্থক উত্তরাধিকারীরাই মূলত গড়ে তোলেন ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন । সেলিনা হোসেন তার ” নিরন্তর ঘন্টা ধ্বনি” নামক উপন্যাসে সোমেন চন্দের উত্তরাধিকারী হিসেবে এনেছেন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী কে। যিনি ইতিহাস সৃষ্টিকারী কবর নাটক রচনা করে ছিলেন সহ জেল বন্দী ও তার রাজনৈতিক গুরু সাহিত্যিক রনেশ দাশগুপ্তের নির্দেশে। ১৯৫৩ই যা অভিনীত হয় ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে। বাংলাদেশের প্রগতিচেতনার ধারায় সোমেন চন্দের অবস্থানকে এভাবেই তিনি ব্যাখ্যা করেন। সোমেনের রাজনৈতিক চেতনার শিল্পিত প্রকাশ কীভাবে তার গল্প-উপন্যাসে ফুটে উঠেছে সে সম্পর্কে তিনি বিশ্লেষণ করেন।

এ ছাড়া তিনি দুই বাংলায় সোমেন চর্চার ইতিহাসও তার আলোচনা য় তুলে ধরেন। বলেন এই চর্চায় সত্তরের দশকে নতুন যে জোয়ার আসে যেখানে প্রেরণাদাতা হিসেবে ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় স্বাধীনতা সংগ্রামী, মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার আসামী ও ভারতের সাম্যবাদী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা কমরেড মুজাফফর আহমদ। যিনি লিখেছিলেন ” পার্টি যখন আইন-সম্মত হল তখন বাইরে এসে সোমেন চন্দের লেখা ‘ইঁদুর’ গল্পটি প্রথম পড়লাম। আমার মন তখন হাহাকার করে উঠল। হায় হায়, এমন ছেলেকে রাজনীতিক মনকষাকষির জন্য রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা মেরে ফেলল! সোমেন বেঁচে থাকলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একটি বিরাট স্তম্ভগড়ে তুলতে পারতেন। তাঁর ছোট গল্প ‘ইঁদুরে’র ইংরেজী তর্জমা করেছেন শ্রী অশোক মিত্র আই.সি.এস। এই গল্প পৃথিবীর বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ লোক তা পড়েছেন। ‘ইঁদুর’ জগতের একটি শ্রেষ্ঠ ছোট গল্প। আর মনীষী সাহিত্যিক রনেশ দাশগুপ্ত সম্পাদিত তার সম্পাদিত “সোমেন চন্দের গল্প গুচ্ছ” এর ভূমিকায় লিখেছিলেন “সোমেন চন্দকে বাংলা ছোটগল্পের সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদী দের একজন পথিকৃৎ বলা যেতে পারে।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ও সমাপ্তি সংগীত উপস্থাপন করেন রবীন্দ্র ভারতী র শিল্পী জয়শ্রী দে ও সোমেন চন্দের *’রাজপথ’ এবং ‘জনশক্তি’ কবিতা দুটি পাঠ করেন বাচিক শিল্পী জয়ন্ত সরকার। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন রাজ্য সম্পাদক তপন দাস। সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সর্ব ভারতীয় বাংলা ভাষা মঞ্চের অন্যতম রাজ্য সম্পাদক অধ্যাপিকা যূথিকা পাণ্ডে।

