জিরো পয়েন্ট নিউজ, ৫ অগাষ্ট ২০২৬ঃ
প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী
“তোমায় পড়েছে মনে
আবার শ্রাবনদিনে
একলা বসে নিরালায়”…..শুভ জন্মদিনে কি লিখবো কি লিখবো করতে করতেই রাত একটা বেজে গেল…চার ভাই বোনের মধ্যে কিশোর কুমার ছিলেন সবার ছোট।ছোট বেলায় পায়ের পাতায় একটু চোট পাওয়ায় প্রায় একমাস ধরে কান্না কাটি করেছিলেন কিশোর কুমার।আর তার পরই নাকি গলার নতুন রুপের প্রকাশ ঘটে।কিশোর কুমার রসিক মানুষ ছিলেন ,অনেক গুণের অধিকারী। তিনি একাধারে গায়ক ও অভিনেতা। এ ছাড়া গীতিকার, সংগীত পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, প্রযোজক এবং চিত্রপরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন। ইন্ডাস্ট্রি তে আসার পিছনে দাদা অশোক কুমার তার ইন্সপিরাশন হিসাবে কাজ করেছে।কিশোর কুমার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কে এল সায়গল ও হলিউডের গায়ক তথা অভিনেতা ড্যানি ক্যায়ে-এর একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। তাঁর গৌরীকুঞ্জের বাড়িতে এই তিনজনের ছবি সব সময় টাঙানো থাকত।এই তিন জনকে প্রণাম করেই তিনি কাজ শুরু করতেন।
আসলে তাঁর এই জীবনে এত রূপ এত কথা কোনটা বলবো কোনটা বলবো না এটা বাছাই করা কঠিন।তাই তাঁর কিছু গল্প আজ আপনাদের শোনাবো।
১৯৪৮ সালে কিশোর কুমার হিন্দি ছবি ‘জিদ্দি’র জন্য মরনে ‘কী দুয়া কেয়া মাঙ্গু’ গানে প্রথম প্লে ব্যাক করেন।
কিশোরের অন্যতম জনপ্রিয় গান, ‘পাঁচ রুপাইয়া বারা আনা’। কীভাবে এসেছিল এই গানের ভাবনা? আসলে গায়কের নিজের জীবনের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এই গান। ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করার পর ইনদওর ক্রিশ্চিয়ান কলেজে ভর্তি হলেন কিশোর। কলেজ জীবনে তামাশা-কৌতুকে পারদর্শী ছিলেন তিনি। কলেজ ক্যান্টিনে ধার করা পাঁচ টাকা বারো পয়সা এখনও ধার হিসাবেই রয়ে গিয়েছে তাঁর। সেই থেকেই নাকি তিনি এই গান বানিয়ে ফেলেন তিনি।
শোলে’ ছবির ‘মেহবুবা ও মেহবুবা’ গানটি কিন্তু কিশোর কুমারেরই গাওয়ার কথা ছিলো। তার বাড়িতে গানটি তৈরি হচ্ছে। গানটি পঞ্চম যেভাবে গাইছিলেন তিনি সেভাবে তুলতে পারছিলেন না। বেশ কয়েকবার চেষ্টার পর হঠাৎ কিশোর কুমার বলে উঠলেন, ‘পঞ্চম, যাই বলো, এই গানটা আমার থেকে তোমার গলায় অনেক ভালো লাগছে। এটা তুমিই গেয়ে দাও। ’ এমনই আর একটি গান ‘ক্যারাভান’ ছবির ‘পিয়া তু অব তো আ যা’। আশা ভোঁসলে ও পঞ্চমের দ্বৈত গান। হওয়ার কথা ছিলো কিশোর কুমার ও আশা ভোঁসলের। কিন্তু এই গানের মাঝে একটা শ্বাসের অংশ আছে। সেটি কিছুতেই আসছে না কিশোরের। এক সময় হাল ছেড়ে দিয়ে পঞ্চমকে বললেন, ‘বুঝলে, এটা তুমিই গেয়ে দাও’।
কিশোর কুমারের অন্যতম সুপার হিট ছবি ‘চলতি কা নাম গাড়ি'(১৯৫৮)-র অনুপ্রেরণা ছিল তাঁরই বাবার পুরনো একটা ক্রাইশলার গাড়ি | কিশোর ভেবেছিলেন কমার্শিয়ালি ফ্লপ হবে এই ছবি আর তা তিনি ইনকাম ট্যাক্স লস হিসেবে দেখাতে পারবেন | কিন্তু তাঁকে অবাক করে দিয়ে এই ছবি সে বছরের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিট হিসেবে সাফল্য পায় ।
সালটা ১৯৫৫। তৈরি হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের কালজয়ী ছবি ‘পথের পাঁচালি’। এদিকে টাকা নেই। কীভাবে শেষ করবেন ছবির কাজ? এগিয়ে এসেছিলেন সেই কিশোর কুমার। তখনকার সময়ে ৫০০০ টাকা দিয়ে সাহায্য করলেন পরিচালককে। তারপরের গল্প সবারই জানা। সেই ছবির হাত ধরেই ১৯৯২ সালে অস্কার এসেছিল দেশে।
সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে বেশ কয়েকটি ছবিতে কাজ করেছিলেন কিশোর কুমার। এমনকি তিনি সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’ ছবিতে গানও গেয়েছিলেন বিনা পারিশ্রমিকে। জানা যায়, ‘চারুলতা’ তৈরির সময় হাতে বিশেষ পুঁজি ছিল না সত্যজিৎ রায়ের। আর কিশোর কুমার সেকথা জানতেন। তবে পরিচালকের মনে হয়েছিল কিশোর কুমার ছাড়া অন্য কোনও গায়কের গলাতেই ঠিক খাপ খাবে না তাঁর ছবির গান। তাই বাধ্য হয়েই কিশোরকে দিয়েই গান গাওয়ালেন। গানের রেকর্ডিংয়ের পরে কিশোর কুমারকে ডেকে পাঠালেন তিনি জিজ্ঞেস করলেন কত পারিশ্রমিক চান? সত্যজিৎ রায় তো ভাবছেন নির্ঘাত একটা বড় অঙ্ক চেয়ে বসবেন গায়ক। কিশোর কুমার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। সত্যজিৎ রায় এর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে জানালেন তাঁর কোনও পারিশ্রমিক লাগবেনা।
এত বড়মাপের শিল্পীকেও শেষ জীবনে রাজ রোষ এ পরতে হয়েছিল।ঘটনাটি হলো …
ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫সালে তাঁর ২০ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। দেশ জুড়ে তাকে জনপ্রিয় করতে হবে। বিদ্যচরণ শুক্লা তখন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী। তাঁর ওপর দায়িত্ব পরলো বলিউডকে কাজে লাগাও। নায়ক-গায়কদের সব এই কর্মসূচির সপক্ষে আকাশবাণী, দূরদর্শনে হাজির কর। ব্যস, জোর কদমে তোড়জোড় শুরু। শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রোগ্রাম করতে নারাজ ছিলেন তিনি কিন্তু ভুল বুঝলো সরকার …এত বড় স্পর্ধা মুখের ওপর না করে বসেছেন দেশের জনপ্রিয়তম গায়ক!

জারি হল সরকারি নির্দেশ — আকাশবাণী বা দূরদর্শনে যেন খবরদার আর না সম্প্রচারিত হয় কিশোরের একটিও গান। তাঁর গ্রামোফোন রেকর্ডের বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হল। ‘ভবিষ্যতের পদক্ষেপ’ হিসেবে আরও কী কী করা যায়, তা ঠিক করতে তৈরি হল কিশোর অভিনয় করছেন এমন ছবির তালিকা। কিশোর নিজের অবস্থানে অটল।ইন্দিরা সরকারের পতনের পরে জনতা সরকার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) জেসি শাহের নেতৃত্বে যে কমিটি গঠন করেছিল জরুরি অবস্থার বাড়াবাড়ি খতিয়ে দেখতে তার রিপোর্টে মেলে এই ঘটনাক্রমের বিবরণ।দিল্লির আকাশে বাতাসে এখনই শোনা যায় সঞ্জয় গান্ধীর সঙ্গে মনোমালিন্য এর জন্যই নাকি পরবর্তী সময়ে কিশোর কুমারের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আয়কর দপ্তর উঠে পড়ে লেগেছিল।
আর কি লিখবো আপনাকে নিয়ে…আসলে আপনি নিজেই একজন ইন্ডাস্ট্রি …আপনার হাত ধরেই বহু মানুষ দিন যাপনের স্বপ্ন দেখেন।আর তার ফলে আপনি বিশ্ব তথা বাঙালির কাছে আভাস থেকে সারাজীবন চির কিশোর হয়ে থাকবেন।জন্মদিনে প্রণাম নেবেন।❤️❤️❤️
ইতি
আপনার গুণমুগ্ধ ভক্ত
প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী
লেখকঃ প্রসেনজিৎ চক্রবর্তী, রসুলপুর, মেমারি, পূর্ব বর্ধমান





