19/06/2026 : 10:35 PM
ট্রেন্ডিং নিউজ

পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন : কেন সবাই আমাদের মতন মিলেমিশে থাকতে চায় না, স্যার?

জিরো পয়েন্ট বিশেষ প্রতিবেদন, মৃণাল দাস :


কেন সবাই আমাদের মতন মিলেমিশে থাকতে চায় না, স্যার?

একজন প্রাক্তন শিক্ষকের ডায়েরি থেকে — ২০ জুন, পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন

অনেক বছর আগের কথা। কলকাতার এক বস্তি এলাকায় বাচ্চাদের পড়াতে গিয়ে একদিন ভারতবর্ষের মানচিত্র খুলে তাদের দেশ চেনানোর চেষ্টা করছিলাম। ঠিক তখনই আট-দশ বছরের একটা মেয়ে, নাক মুছতে মুছতে, প্রশ্ন করল—

“স্যার, আমাদের পশ্চিমবঙ্গ ভারতের পূর্ব দিকে কেন?”

ভৌগোলিক উত্তরটা অনেকেই জানেন। কিন্তু একটা ছোট্ট মাথাকে একবার প্রশ্ন করার সুযোগ দিলে বোঝা যায়, নিজের জ্ঞানের সীমাটা ঠিক কতদূর।

আমি বললাম, আসলে বাংলাদেশ আর আমাদের আজকের পশ্চিমবঙ্গ একসময় একই রাজ্য ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় বাংলাকে ভেঙে পূর্বদিকের অংশকে পূর্ববঙ্গ আর আমাদের অংশকে পশ্চিমবঙ্গ নাম দেওয়া হয়।

উত্তর শেষ হতেই আরেকটা প্রশ্ন উড়ে এল—”কেন ভেঙে দিল? বাংলাকে গোটা রাখা হল না কেন?”

দেশভাগ, পাকিস্তান, ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের জটিলতা—এসব কীভাবে আট-দশ বছরের বাচ্চাকে বোঝাব ভাবছি, তখনই আরেকটা ছেলে নাক খুঁটতে খুঁটতে বলল, “আচ্ছা স্যার, আবার জোড়া লাগানো যায় না?”

এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে ছিল না। তাই ফিরে গেলাম ইতিহাসের পাতায়।

বঙ্গভঙ্গ: প্রথম আঘাত :


১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর তৎকালীন বড়লাট লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার অজুহাত দিয়ে অখণ্ড বাংলা প্রদেশকে দু’ভাগে ভাগ করেন—পূর্ববঙ্গ ও আসাম (রাজধানী ঢাকা), আর পশ্চিমবঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যা (রাজধানী কলকাতা)। অজুহাত প্রশাসনিক, কিন্তু উদ্দেশ্য ছিল গভীরতর।

আমার ছাত্রদের কাছে এটা বোঝানো সহজ ছিল না, কিন্তু চেষ্টা করেছিলাম এক প্রবাদের ভাষায়। চাণক্যনীতিতে বলা হয়—কোনো শত্রুকে বশ করার চারটি উপায়: সাম (বুঝিয়ে), দাম (উপহার দিয়ে), দণ্ড (শাস্তি দিয়ে), আর ভেদ (বিভেদ সৃষ্টি করে)। প্রথম তিনটিতে যখন ব্রিটিশ বাংলাকে বাগে আনতে পারল না—সাহিত্যে, বিজ্ঞানে, বিপ্লবে বাংলা যখন বারবার তাদের চ্যালেঞ্জ করল—তখন তারা বেছে নিল শেষ অস্ত্র: ভেদ। হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের রাজনীতি।

কিন্তু বাংলার মানুষ এমনভাবে প্রতিবাদ করেছিল যে সেই বিভাজন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ছয় বছরের মাথায়, ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর, দিল্লির দরবারে সম্রাট পঞ্চম জর্জ স্বয়ং ঘোষণা করেন বঙ্গভঙ্গ রদের কথা। আর সেই একই ঘোষণায়, প্রায় প্রতিশোধ নেওয়ার ভঙ্গিতে, ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় দিল্লিতে। বাংলার রাজনৈতিক কেন্দ্রটাকেই ভেঙে দেওয়া হল।

প্রথম আঘাত সামাল দেওয়া গিয়েছিল। কিন্তু চার দশক পর ব্রিটিশ যখন শেষবারের মতো বাংলাকে ভাঙল, তখন আর জোড়া লাগেনি।

অখণ্ড বাংলার শেষ স্বপ্ন :


১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টের “ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে”-র পর কলকাতা, নোয়াখালি, বিহার, পাঞ্জাব—উপমহাদেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ প্রশাসন বুঝে যায়, তারা আর শাসন টিকিয়ে রাখতে পারবে না। প্রশ্ন তখন একটাই—বাংলা কি অখণ্ড থাকবে, না ভাগ হবে?

এই সংকটের মধ্যেই ১৯৪৭ সালের মে মাসে একটা শেষ চেষ্টা হয়েছিল। বাংলার তখনকার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু—নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দাদা—একসঙ্গে বসে একটা রূপরেখা তৈরি করেন, যা ইতিহাসে পরিচিত “বসু-সোহরাওয়ার্দী চুক্তি” নামে। প্রস্তাব ছিল—বাংলা ভারত বা পাকিস্তান, কোনোটির অংশ না হয়ে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে, যেখানে হিন্দু-মুসলমান জনসংখ্যা অনুপাতে আসন ভাগ করে যৌথ সরকার চালাবে।

স্বপ্নটা সুন্দর ছিল। কিন্তু বাস্তবে দাঁড়াল না। মুসলিম লীগের একটা বড় অংশ এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করল, দিল্লি ছুটে গিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রচার চালাল। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব—জওহরলাল নেহরু, বল্লভভাই প্যাটেল—এই পরিকল্পনাকে আমল দিলেন না। আর হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একে স্রেফ একটা কৌশল বলে আক্রমণ করলেন, যার আসল লক্ষ্য কলকাতা ও শিল্পাঞ্চলকে মুসলিম লীগের নিয়ন্ত্রণে রাখা। হিন্দু আর মুসলমান নেতাদের মধ্যে আস্থার এত অভাব ছিল যে, একসঙ্গে থাকার শেষ সুযোগটাও হাতছাড়া হয়ে গেল।

২০ জুন, ১৯৪৭: যে ভোট রাজ্য তৈরি করল:


অখণ্ড বাংলার স্বপ্ন ভেঙে পড়ার পর বঙ্গীয় আইনসভায় বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য ভোট হয় ২০ জুন। প্রথমে যৌথ অধিবেশনে ১২০-৯০ ভোটে সিদ্ধান্ত হয়—বাংলা পাকিস্তানে গেলে অখণ্ড থাকবে। তারপর পশ্চিমাঞ্চলের সদস্যদের আলাদা বৈঠকে ৫৮-২১ ভোটে সিদ্ধান্ত হয়, প্রদেশ ভাগ হোক এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের গণপরিষদে যুক্ত হোক। পূর্বাঞ্চলের সদস্যদের পৃথক সভায় ১০৬-৩৫ ভোটে ভাগের বিরোধিতা হলেও, ১০৭-৩৪ ভোটে স্থির হয় যে দেশভাগ হলে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানেই যোগ দেবে।

এই ভোটেই জন্ম নেয় আজকের পশ্চিমবঙ্গ। ৫৮ জন প্রতিনিধির মধ্যে ছিলেন কংগ্রেস, কমিউনিস্ট পার্টি, তফসিলি জাতি দল এবং হিন্দু মহাসভার একমাত্র প্রতিনিধি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়—সবাই একসঙ্গে। ইতিহাস তাই এটাকে কোনো একজনের একক কৃতিত্ব বলে না; এটা ছিল এক জটিল রাজনৈতিক সমঝোতার ফল, যেখানে অনেক স্বর মিলে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল।

বাংলা ভাগ হল, কিন্তু কী হারাল?


১৯০৫ সালে যখন হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে রাস্তায় নেমে বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদ করেছিল, তারা কি কল্পনাও করেছিল যে মাত্র ৪২ বছর পর বাংলা সত্যিই ভেঙে যাবে—এবার আর জোড়া লাগার সুযোগ থাকবে না?

ইতিহাসবিদরা বলেন, ইতিহাসে “যদি” শব্দের কোনো জায়গা নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্নগুলো থেকেই যায়। যদি অখণ্ড বাংলার প্রস্তাব সফল হত? যদি কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ শেষ মুহূর্তে কোনো রাস্তা খুঁজে পেত?

পশ্চিমবঙ্গ দিবস তাই শুধু একটা রাজ্যের জন্মদিন নয়—এটা একই সঙ্গে একটা বিচ্ছেদের স্মৃতিও। একদিকে আমরা পশ্চিমবঙ্গ পেয়েছি। অন্যদিকে হারিয়েছি অবিভক্ত বাংলাকে। ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, নোয়াখালি, চট্টগ্রাম—যে ভূখণ্ডগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালির সাহিত্য, সংস্কৃতি আর অর্থনীতির অংশ ছিল, সেগুলো একদিনের ভোটে রাজনৈতিক সীমানার ওপারে চলে গেল। লক্ষ লক্ষ মানুষ উদ্বাস্তু হলেন। কেউ ধর্মের কারণে, কেউ ভয়ে, কেউ রাজনৈতিক বাস্তবতার চাপে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হলেন।

ব্রিটিশের “ডিভাইড অ্যান্ড রুল” নীতি নিশ্চয়ই সেই আগুনে ঘি ঢেলেছিল। কিন্তু শুধু তাদের দোষ দিয়ে কি আমরা দায় শেষ করতে পারি? আমাদের নিজেদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামাজিক বিভাজন, সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাস—এসবও কি সেই ট্র্যাজেডির অংশ ছিল না?

আত্মসমালোচনার দিন :


আজ যখন আমরা পশ্চিমবঙ্গ দিবস নিয়ে আলোচনা করি বা তর্ক করি, তখন বড় প্রশ্নটা প্রায়ই ভুলে যাই—একটা জাতি কীভাবে তার নিজের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়?

কারণ ২০ জুনের ভোট আমাদের একটা রাজ্য দিয়েছে। কিন্তু তারও আগে ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—বিভাজনের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত কাউকে সম্পূর্ণ জয়ী করে না। সীমানা তৈরি হয়, রাষ্ট্র তৈরি হয়, কিন্তু হারিয়ে যায় মানুষের স্মৃতি, সম্পর্ক, ভাষার ভেতরের অদৃশ্য বন্ধন। সেই কারণেই ২০ জুন শুধু পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন নয়—এটা আমাদের আত্মসমালোচনারও দিন।

তবে একটা সত্য নিয়ে তর্ক নেই—১৯৪৭ সালের ২০ জুনের সেই ভোটের ফলেই আজকের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের জন্ম। ভালো হোক বা খারাপ, কেউ হিন্দু হোক বা মুসলিম—এই দিনটিই পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিন।

একটাই প্রশ্ন :


এত কিছু আমি সেদিন আমার ওই আট-দশ বছরের গরিব ছাত্রছাত্রীদের বলিনি। ওদের মধ্যে গোটা ভারতবর্ষটাই ছিল—কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ ওবিসি, এসসি, এসটি, কেউ আবার পরিচয়হীন অনাথ। কিন্তু সবাই গরিব। এত রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক আলোচনার পরেও ওরা বারবার একটাই প্রশ্ন করত—

“স্যার, সবাই আমাদের মতন মিলেমিশে কেন থাকতে চায় না?”

এই প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার কাছে নেই। আপনার কাছে থাকলে জানাবেন।


মৃণাল দাস : লেখক একজন চিত্রপরিচালক ও প্রাক্তন শিক্ষক । প্রবন্ধে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক তথ্য উইকিপিডিয়া, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা গ্রন্থাগারের নথি এবং প্রাসঙ্গিক ইতিহাসচর্চা থেকে সংগৃহীত।

আরও পড়ুন

https://ezeropoint.net/news/498438…..

 

Related posts

মাহে রমজান উপলক্ষে ইফতার মাহফিল জামালপুরে

E Zero Point

বাঙালির প্রাণের দুই কবির জন্মদিন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা মেমারিতে

E Zero Point

এবার মেমারিতে অত্যাধুনিক আলট্রাসোনোগ্রাফি মেশিন

E Zero Point

মতামত দিন