শিক্ষক দিবস
দিলীপ সাঁতরা
এই পৃথিবীতে প্রথম ভূমিষ্ঠের পর
যিনি আমার মুখে ভাষা যুগিয়েছেন
আমাকে – মা – বলা শিখিয়েছেন
সেই – মা – আমার প্রথম শিক্ষক।
তারপর কেটেছে বহুকাল
মাষ্টার মশাই থেকে শুরু করে কত জনের কাছেই না
শিখেছি এবং শিখছি
শিক্ষার কোনো শেষ নেই।
কোন ছোটো বেলায় বাবা বারবার বলতেন
মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন
ওরে লেখাপড়া শিখছিস —
মানুষের মতো মানুষ হোস
যেন পাঁচ জনের একজন হতে পারিস
বাবা জীবনের শিক্ষার পথপ্রদর্শক
তিনিও আমার শিক্ষক।
স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানীও শিক্ষক শিক্ষিকাবৃন্দকে
আজিকার শিক্ষক দিবসে অন্তরের পরম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি
আবার এই আঙিনার মধ্যেই যে অসংখ্য শিক্ষক শিক্ষিকা আছেন
তাঁদেরও যথাযথ সম্মান জানাই।
যাঁরা মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেও
শিক্ষক শিক্ষিকা নামক সরকারি চাকরি পেতে পারেননি
তাঁরা প্রাইভেট শিক্ষকতা করে দিন যাপন করছেন বাঁচার জন্য
যাঁরা গানের নাচের আঁকার আবৃত্তির স্কুল চালিয়ে
জীবন যাপন করেন শিক্ষকতায় তাঁদের ভূমিকা কম কিসের
বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাঁরা তবলার শিক্ষকতা করেন এবং তালিম দিয়ে
জীবিকা নির্বাহ করছেন তাঁরাও শিক্ষক।
যাঁরা সাহস দিয়ে বলেন —
স্কুল শিক্ষার সাথে সাথে গান নাচ নাটক আবৃত্তি কিংবা খেলাধূলা বা লেখার চর্চা চালিয়ে যাও
তোমার এটা ভালো হবে তিনিও সমাজের প্রণম্য শিক্ষক।
যে কৃষক তাঁতি কামার কুমোর প্রেসকর্মি মৃৎশিল্পী
বংশ পরম্পরায় পেশাগত শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন
সমাজ সভ্যতার বিকাশে শিক্ষক হিসেবে তাঁদের ভূমিকা ভুলি কি করে!
যাঁরা শিক্ষা গ্রহণের জন্য –
অভাবী মেধাবীদের জীবনের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে পাশে থাকছেন
তাঁরা হয়তো পেশাগত শিক্ষকতায় ছিলেন না
স্বেচ্ছা শিক্ষাব্রতী হিসেবে যে কাজ করে যাচ্ছেন
তাঁদেরকেও শিক্ষক দিবসে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি।
যারা রাজনীতির আঙিনা থেকেই সমাজ গড়ার কারিগর হিসেবে
নিঃস্বার্থে সারাটা জীবন দিয়েই গেলেন এবং
যাঁরা সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে কিংবা যাত্রা নাটক সিনেমায়
নির্দেশক হিসেবে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে থাকেন
যাঁদের একটি শব্দ বাক্য —
সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করে
নিঃশব্দে নীরবে তাঁরা যে কতোবড় দার্শনিক ভবিষ্যতে মানুষ বুঝতে পারেন
তাঁরাও প্রণম্য তাঁরাও শিক্ষক
সর্ব পল্লী রাধাকৃষ্ণাণের শুভ জন্মদিনে
সার্থক হোক ধন্য হোক ভারতের জাতীয় শিক্ষক দিবস।
এই কথা আবার বলি
যাঁরা সুশীল সমাজে সুশিক্ষা দিয়ে থাকেন
তাঁরাই প্রকৃত শিক্ষক শিক্ষিকা
তাঁদের শ্রদ্ধা সম্মান প্রণাম জানাই
ছাত্রছাত্রী শিক্ষক শিক্ষিকার সুসম্পর্ক বজায় থাক
এই বিনীত প্রার্থনাটাই করে যাই।
(A+B) হোল স্কোয়ার
উজ্জ্বল দাস
বছর পঞ্চাশ হবে হয়তো!
আজও মনে পড়ে, একদিন বলেছিলেন-
“আমি হয়তো থাকবো না, কিন্তু আমার তৈরি হাজারখানেক মস্তিস্ক আমি রেখে যাবো।”
তখন আমি ক্লাস এইট।
কিছুতেই উত্তরমালা ছাড়া অঙ্ক কষতে পারতাম না।
ফার্ষ্ট টার্ম এক্সামে টেনেটুনে ষোলো পেলাম।
টিফিনের সময় গালে হাত দিয়ে বেঞ্চে বসে সাতপাঁচ ভাবছি…
দেখতে পেয়ে এগিয়ে এলেন তিনি!
পরম মমতায় মাথায় হাত রেখে বলেলেন-
“কী রে ষোলো পেয়েছিস তাতে কী হয়েছে?
আমি তো আছি!”
বিদ্যুৎ খেলে গেছিলো গোটা শরীরে।
মনে হয়েছিল স্বয়ং মা সরস্বতী ভর ক’রলেন।
শুরু হলো তালিম।
স্কুল ছুটির পর প্রত্যেকদিন নিয়ম করে স্যারের বাড়ি যাওয়া।
প্রাইভেট টিউশন কখনও করতেন না।
ম্যাথমেটিক্সে দুর্বল স্টুডেন্টদের আলাদা ক’রে তালিম দিতেন বটে,
তাও নিখরচায়।
সেকেন্ড টার্মে ষোলো থেকে সাতান্ন।
জেদ চেপে গেল মনে।
সফলতাকে চাক্ষুষ করলাম।
উঠতে বসতে, মাথায় গিজগিজ করতে থাকলো…
অ্যালজেব্রা- নাম্বারস্ ফর্মূলা:
এ স্কোয়ার প্লাস টু এ বি প্লাস বি স্কোয়ার।
বড় বড় অঙ্ক মুখে মুখেই ক’রে ফেলতে লাগলাম একটা সময়ে।
তখন বুঝতে পারলাম,
উনি আমাদের অংক শেখাননি,
অংককে ভালোবাসতে শিখিয়ে ছিলেন।
তারপর…
তারপর স্কুলের পাঠ চুকলো,
ম্যাথমেটিক্সে কবে যেন মাস্টার্স করে ফেললাম।
বড় হয়ে গেলাম আমরা।
বন্ধুরাও সব যে যার মত সেটেল্ড্ হ’তে শুরু করলো।
স্কুল ছাড়ার পর তাও একটু আধটু যোগাযোগ রেখেছিলাম স্যারের সাথে।
ওই যে, হিউম্যান বিহেভিয়র,
ক্রমশ সেটাও বন্ধ হয়ে যায়।
এরপরেই এলো কঠোর পরিশ্রমের সফলতা।
হাতে এলো অ্যাপয়েন্টমেন্ট্ লেটার।
স্ট্যাটিস্টিকাল রিসার্চ, ইন এ বিগ অর্গানাইজেশন।
পেয়েই দৌড়লাম স্যারের কাছে,
বাড়ি ঢোকার মুখেই দেখলাম
রাজীব, তিমির, অরিন্দম, অভিজিৎ সব দাঁড়িয়ে।
ততক্ষণে সরস্বতী পুজো শুরু হয়ে গেছে।
সাদা কাপড়ে মুড়ে চোখ ঢেকে গেছে তুলসী পাতায়।
মাঝের কয়েকটা বছর, ব্যাস।
কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেল একটা গোটা পৃথিবী।
একটা অপরাধবোধ কাজ করতে শুরু করলো।
মিশে গেলাম মাটিতে!
ক্রমশ মনে হ’তে লাগলো এমন একটা খবর…
আমার ঈশ্বর জানতে পারলেন না।
সবটাই তো তোমার পায়ে অঞ্জলি দেবো বলে দৌড়ে আসা।
হঠাৎ সেই স্পর্শ,
“কী ভাবছিস আমি চলে গেছি !
ধুর পাগলা, আমি তো আছি-
উইশ ইউ অল দ্যা বেস্ট…
শিগ্গির জয়েন কর।“
চোখ মুছে মাথা তুলতেই দেখলাম
গনগনে আঁচে
কুণ্ডুলি পাকিয়ে একগাল হেসে-
মিলিয়ে যাচ্ছে কালো মোটা একটা চশমার ফ্রেম।
“আমার এই দেহখানি তুলে ধরো
তোমার ওই দেবলয়ের প্রদীপ করো।
নিশিদিন আলোক শিখা জ্বলুক গানে
আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে…
তিমির-বিদার
তন্দ্রা বোস
অন্ধকার ভেদ করে যে আলো ছড়ায় প্রাতে,তুমি সেই ধ্রুবতারা
ধন্য মোরা তোমার সাথেই শিক্ষা তো আজ দিশাহারা।
মানবতার শ্রেষ্ঠ কারিগর, তুমি হে আলোকবর্তিকা
তোমারই দেওয়া দীক্ষায় ললাটে জয়ের তিলকা।
জ্ঞানের গভীর সাগরে মোদের ভাসিয়ে দিলে তরী
ধৈর্য আর ত্যাগের মহিমায় জীবন দিলে গড়ি।
ভুলত্রুটি সব মার্জনা করে আরও একবার দেখাও সত্যের পথ
তোমারই আশিসে ছুটে চলে মোদের ভারত-রথ।
তুমি এক নিঃশব্দ সাধক, সমাজ গড়ার মূল ভিত্তি
তোমারই চরণে লুটিয়ে পড়ে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ কীর্তি।
ভাষাহীন বুকে ভাষা দাও তুমি
ম্লান মুখে দাও হাসি
তোমারই ত্যাগের আলোকমালায় ছিঁড়ে যায় অজ্ঞতার রশি ।
মহীরুহ সম ছায়া দিয়ে যাও যুগ যুগন্তের সীমানা ছাড়ি
তোমার চরণে অবনত মস্তক, হে জ্ঞান-অধিকারী।
শ্রদ্ধা আর ভক্তির অর্ঘ্য সঁপিলাম আজ হে শিক্ষক চরণে
চিরকাল অম্লান রবে তুমি মোদের স্মরণে।
হে মহান গুরু, লহো মোর অন্তহীন শত প্রণাম
তোমারই আলোয় ধন্য হোক এই মর্ত্য জন্ম-ধাম।
ব্যক্তির স্তুতি নয়, এ তো আলোর বন্দনা
যে আলো ঘুচায় সমাজের যত কলঙ্ক আর লাঞ্ছনা।
কুসংস্কারের প্রাচীর ভেঙে যে চেতনা জাগে প্রাণে
শ্রেণিভেদ ভুলে সাম্যের গান ধ্বনিত তোমার গানে।
শিক্ষাই শেখায় প্রশ্ন করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে
মুক্তচিন্তার বীজ বুনে দেয় প্রতিটি নতুন প্রভাতে।
যে সমাজ আজ স্বার্থে অন্ধ, হিংসায় জরাজীর্ণ
তোমারই দেওয়া শিক্ষায় হোক সে অন্ধকার দীর্ণ।
ন্যায়, নীতি আর মানবতায় হোক তিমির-বিদার
শিক্ষা- আলোর পথে মোরা হই অগ্রসর।


