05/09/2026 : 7:40 PM
বিশেষ দিনের লেখাসাহিত্য

প্রশ্ন – শিক্ষক কাকে বলে? কয় প্রকার ও কী কী ? উদাহরণ সহ লেখ। ১০ নম্বর

মৃণাল দাস


প্রশ্ন – শিক্ষক কাকে বলে? কয় প্রকার ও কী কী ? উদাহরণ সহ লেখ। ১০ নম্বর

উত্তর – শিক্ষক সম্পর্কে বলতে গেলে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে শিক্ষক শব্দের উৎস ও প্রকৃত অর্থ।

ভূমিকা ও ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ :

শিক্ষ্ + ণিচ্ + অক, ‘শিক্ষক’ শব্দটি এই প্রকারে গঠিত হয়েছে। এখানে ‘শিক্ষ্’ ধাতুর অর্থ হলো শেখা বা জানা। এর সঙ্গে ‘ণিচ্’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে এটি প্রযোজক বা কারক অর্থে রূপান্তরিত হয়, যার অর্থ দাঁড়ায় অন্যকে শেখানো বা জ্ঞান দান করা।

সহজ কথায় শিক্ষক শব্দের অর্থ হলো, যিনি বা যে শিক্ষা দেয়। শিক্ষক শব্দটি যদিও বাংলা ভাষায় আমরা পুংলিঙ্গ হিসাবে ব্যবহার করি, তবে Teacher কিন্তু উভলিঙ্গ (Common Gender) হিসাবে ব্যবহার হয়। এই লেখায় (থুরি প্রশ্নের উত্তরে) আমরা উভলিঙ্গ মাথায় রেখেই শিক্ষক শব্দকে ব্যবহার করব।

এই বিষয়ে আর একটু গভীরে জানতে গেলে আমাদের শিক্ষা সম্পর্কেউ জানতে হবে।

শিক্ষা কাকে বলে :

ধারাবাহিক ভাবে যেকোনো বিষয়ে জ্ঞান (knowledge), দক্ষতা (skills), মূল্যবোধ (values), আচরণ বা অভ্যাস (habit) অর্জন করা এবং নিপুণ পরিকাঠামোর মাধ্যমে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেবার যে প্রক্রিয়া, তাকে শিক্ষা বলে।

সহজ ভাষায়, যা কিছু আমরা পড়ি লিখি দেখি বুঝি শুনি আর বারবার অভ্যাস করি, সেটাই শিক্ষা। কিছু বিষয় একা শেখা যায়, কিছু সমষ্টিগত ভাবে। তবে অধিকাংশ শিক্ষা আমাদের অন্তর থেকে বহির্মুখী হয়ে সমাজ ও পরিবেশের সাথে মিশে যায়।

স্কুলের বই হতে পারে বা ট্রেনের কামরায় একজন অপরিচিত মানুষের ফোনে কারোর সাথে কথা বলার ধরন; বাবা মায়ের ঝগড়ার বিষয় ও মুখের ভাষা বা দুর্গা পুজোয় দেবী আরাধনার মন্ত্র – আমরা সব জায়গা থেকে শিখতে পারি।

মূল বিষয়, শিক্ষক কাকে বলে :

শিক্ষা দেওয়া একটা দ্বিমুখী পথ। না নিতে জানলে, দেওয়া প্রায় অসম্ভব। প্রথাগত ভাবে আমরা মনে করি, যিনি ক্লাসরুমে কয়েকজন কম বয়সী ছেলে মেয়ের সামনে দাঁড়িয়ে হাত পা নেড়ে কিছু বোঝান (মাঝে মাঝে বকাঝকাও করেন) তিনি শিক্ষক। সঠিক, কিন্তু একমাত্র শিক্ষক নন। আসলেই শিক্ষক উভয় পাক্ষিক। হ্যাঁ, একটা বিষয়ে কোনো জ্ঞানী, অভিজ্ঞ মানুষ যখন কিছু শেখাতে চান, তাঁকেই আমরা শিক্ষক বলি। কিন্তু যে শিক্ষার্থী তাঁকে নতুন একটা প্রশ্ন করল বা মন দিয়ে সবটা শিখল, তার কাছ থেকেও তো আনুগত্য, মনোযোগ, চিন্তার বিস্তার শেখা সম্ভব।

যেমন একটা বাচ্চা একা জন্ম নেয় না, তার সাথে জন্ম হয় তার বাবা মায়েরও। বাবা মা যেমন বাচ্চাকে হাঁটা,খাওয়া, জীবন শৈলী শেখায়, বাচ্চার কাছ থেকেও বাবা মা শেখে ধৈর্য, হাসি, সারল্য, হারিয়ে যাওয়া শৈশব। ঠিক তেমন সকলেই আমাদের শিক্ষক হতে পারেন; আবার আমরাও সকলের শিক্ষক।

প্রকারভেদ :

শিক্ষক একটি কর্তা, একে কর্ম ও দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে আমরা অনেক ভাগে ভাগ করতে পারি। কিন্তু মোটের ওপর আমরা দুটো উল্লেখযোগ্য প্রকারভেদে মনোযোগ দেব –

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক :
যেকোনো স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির সিলেবাসের বিষয় যিনি আমাদের শেখান। এছাড়াও যেকোনো শিল্প সাধনা, যেমন গান নাচ আবৃত্তি অভিনয় বিষয়ে পরীক্ষার মাধ্যমে যে শিক্ষা লাভ হয়; সাথে চাকরির পরীক্ষা, বা রিসার্চ সংক্রান্ত বিষয়ে যিনি মেন্টর বা গাইড তাঁরা সকলেই এই প্রকারের শিক্ষক। মূলত একটা সিলেবাস স্ট্রাকচার ও পরীক্ষা, পেপার জমাই হলো এর প্রধান মাপকাঠি। প্রধানত এঁরাই শিক্ষক দিবসের গিফট ও শুভেচ্ছা পায়, আর সুযোগ থাকলে সন্ধ্যে বেলা পড়তে গেলে মিষ্টি সিঙাড়া বা বিরিয়ানি খাওয়ান।

অ-প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক :
এটি একটি বিস্তর প্রকার। এর মধ্যে আমাদের জীবনের সকল মানুষ, প্রাণী, প্রকৃতি এবং ঘটনা লুকিয়ে আছে। এদেরকেও কিছু নির্বাচিত উপ-বিভাগে বিভক্ত করা যায় –

পাঠ্য শিক্ষক : একটা উপন্যাস, গল্প, কবিতার বই বা একটা ম্যাগাজিন, এমনকি ভেলপুরি খাবার পর হাতের টুকরো খবরের কাগজ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে দিয়ে যেতে পারে। আমরা যখনই কিছু পড়ি, আমাদের কল্পনা করোটি ছাড়িয়ে পৌঁছে যায় লেখার বিষয়ে। আমরা পৌঁছে যাই চাঁদের পাহাড়ে, দেখতে পাই মেঘবালিকাদের, উত্তেজিত হই খবরের কাগজের হেডলাইন দেখে।

লিপি শিক্ষক : প্রথম যেদিন লিটল ম্যাগাজিনের জন্য সম্পাদকীয় লিখি, সাথে সাহিত্য সভার পোস্টার, যেদিন প্রথম কবিতা সাজাই পেনসিলে , সব দিন আমি শিখেছি। একটা অফিসের ফরমাল চিঠি বা ইমেইল, বান্ধবীকে লেখা ভুল বানানের প্রেমপত্র, স্টুডেন্ট প্রোটেস্ট প্ল্যাকার্ডের ছোট্ট ছন্দ, বা দিনশেষে ডায়রিতে উজাড় করা দিনলিপি – যত লেখা তত শেখা।

দৃশ্য শিক্ষক : আমাদের সব শিক্ষার মধ্যে সত্তর শতাংশ এই শিক্ষকের অবদান। বই পড়লে দেখতে হবে, লিখতে গেলেও দেখতে হবে। কিন্তু কিছু বিশেষ বিষয়ের কথা মাথায় আসছে। প্রথমেই বলব প্রকৃতির কথা। মেঘালয়ের ক্রেমচম্পি গুহার ভিতর, লাইফ জ্যাকেট পরে, গভীর জলে চিৎ হয়ে শুয়ে দেখেছিলাম অন্ধকার ভয়ংকর, প্রায় ৬০-৭০ ফুট ওপরে, গুহার দেওয়াল থেকে টপটপ করে জল পড়ছিল আমার চারপাশে। ওই দৃশ্য ভুলিনি। ভুলিনি তাণ্ডব বৃষ্টি ঝড়ের মধ্যে বিকেলের পুরীর উত্তাল ঢেউ। পথ হারিয়ে একবার বাঁকুড়ার এক ঘন জঙ্গলের মাঝখানে চলে গেছিলাম, একাই। বাড়ি ফেরার তাগিদ ও ভয় ছিল, ছোট বয়স। কিন্তু বিকেল ভাঙা সূর্যের আলো যখন গায়ে গায়ে লেপ্টে থাকা পাতা ডালের মাঝ দিয়ে জঙ্গলময় ছড়িয়ে পড়ছিল, ভয় ভুলে বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম। যেন ভগবানের আশীর্বাদ।
যখন প্রথম নাটকের মঞ্চে উঠে কালো কালো মাথাগুলো দেখেছিলাম দর্শকাসনে, আমি শিখেছিলাম অভিনয়ের অনুভূতি। একটা ভালো সিনেমা দেখে বদলে গেছে তীব্র কিছু ধারণা, একটা ছবির সামনে ঘণ্টার ওপর দাঁড়িয়ে থেকেছি। জীবনের প্রত্যেক ধাপে চোখ খুলে শিখেছি। শিখেছি অন্ধকারে পথ চলাও।

শ্রবণ শিক্ষা : গুহার ছাদ থেকে ঝরে পড়া জলের সেই টুপটাপ শব্দ, সমুদ্রের গর্জন, জঙ্গলের ঝিঁঝিঁ পোকা আর পাখির ডাক, শিখিয়ে দিয়েছে কেমন করে কান আমাদের ভারসাম্য রক্ষা করে। কেবল দেখলে হয় না, শুনতে হয়। কেবল বললে হয় না, বুঝতে হয়। মিছিলের উচ্ছ্বাস ধ্বনি আমাদের একতা শিখিয়েছে, মা বাবার ডাক আমাদের আশ্রয় শিখিয়েছে। প্রিয় মানুষের ফোনে বলা কথা, আমাদের ভালোবাসতে শিখিয়েছে। জন্মের পর আমরা কথা বলা শিখেছি শুনে শুনে।

আত্ম বিশ্লেষণ :
সর্বোপরি নিজের জীবনের প্রতিটা দিন, মুহূর্ত, ক্ষণে, ঘটনায় আমরা শিখছি। ছাত্রদশা আমাদের ঘুচবে না। মানুষ হোক বা প্রকৃতি, পশুপাখি হোক বা কোনো ঘটনা, আমরা ততটাই শিখতে পারব, যতটা ভালো আমরা ছাত্র। নিজের শিখতে পারার গুণমানের ওপর নির্ভর করে কে বা কারা আমাদের শিক্ষক ছিলেন বা হবেন। কারণ যতক্ষণ কেউ শিখতে না চায়, সে নিজে কারোর শিক্ষক হতে পারে না। দেওয়ালে বড় বড় ডিগ্রির সার্টিফিকেট ফ্রেম করে ঝুলিয়েও, অশিক্ষিত হওয়া যায়।

উপসংহার :
আরও অনেক বিস্তার লেখা যেত, তবে ১০ নম্বরের জন্য এর থেকে বেশি লিখলে লুজ শিট নিতে হবে। স্যার / ম্যাডাম দেবেন না। তাই আজ এই পর্যন্ত। যারা পড়লেন এই লেখা, আমার জন্য আপনারা সবাই শিক্ষক। সকলকে শিক্ষক দিবসের শুভেচ্ছা।

নিজ মতামত এর সাথে কমেন্টে নম্বরটাও দিয়ে দেবেন, ১০ এর মধ্যে কত পেলাম জানা দরকার।

Related posts

দৈনিক কবিতাঃ দেশপ্রেমিক ক্ষুদিরাম

E Zero Point

সোমেন চন্দ স্মরণ সভা কলকাতায়

E Zero Point

রবিবারের আড্ডাঃ জিরো পয়েন্ট সাহিত্য আড্ডাঃ ৮ মে ২০২২

E Zero Point

মতামত দিন