27/02/2026 : 4:27 PM
আমার দেশ

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস: ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভারতের যাত্রা

জিরো পয়েন্ট নিউজ – ১৮ এপ্রিল ২০২৫ :


“ঐতিহ্য বলতে শুধু ইতিহাসকেই বোঝায় না, এটি মানবতার এক অভিন্ন চেতনা। যখনই আমরা ঐতিহাসিক স্থানগুলির দিকে তাকাই, তখন আমাদের মন বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বিষয়গুলির ঊর্ধ্বে উত্তীর্ণ হয়।”

-প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

 

সারসংক্ষেপ –


• সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের সম্মান ও সংরক্ষণে প্রতি বছর ১৮ এপ্রিল দিনটি বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

• এই বছরের মূল ভাবনা হল “দুর্যোগ ও সংঘাতের বিপদের মধ্যে ঐতিহ্য : আইসিওএমওএস-এর ৬০ বছরের কর্মধারা থেকে প্রস্তুতি ও শিক্ষা”।

• বিশ্ব ঐতিহ্য কনভেনশন একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি, এটি ১৯৭২ সালে ইউনেসকো প্রণয়ন করে।

• বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক স্থানগুলি রক্ষার জন্য বিশ্ব ঐতিহ্য কনভেনশন গ্রহণ করেছে।

• ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত ১৯৬টি দেশে মোট ১,২২৩টি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে (এর মধ্যে ৯৫২টি সাংস্কৃতিক, ২৩১টি প্রাকৃতিক এবং ৪০টি মিশ্র)।

• ভারতে মোট ৪৩টি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। এর মধ্যে আগ্রা ফোর্ট, তাজমহল, অজন্তা ও ইলোরার গুহা ১৯৮৩ সালে প্রথম তালিকাভুক্ত হয়েছিল।

সূচনা :-


আমাদের ঐতিহ্য কেবল পাথর, লিপি অথবা ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি নয়। মন্দিরের দেওয়ালের ফিসফাস, সুপ্রাচীন দুর্গের খোদাই, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা লোকসঙ্গীতের মধ্যে ঐতিহ্যের বাস। আমরা কী ছিলাম, কীসের জন্য আমরা বেঁচে রয়েছি, কীভাবে আমরা সব প্রতিবন্ধকতা সহ্য করতে পারছি – ঐতিহ্য আমাদের সেই গল্প বলে। এই সব কালজয়ী সম্পদ শুধু যে তারিফ করার জন্য নয়, এগুলির সংরক্ষণের প্রয়োজনও রয়েছে – বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস আমাদের সেই কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিশ্ব ঐতিহ্য দিবসের এবারের মূল ভাবনা হল – “দুর্যোগ ও সংঘাতের বিপদের মধ্যে ঐতিহ্য : আইসিওএমওএস-এর ৬০ বছরের কর্মধারা থেকে প্রস্তুতি ও শিক্ষা”।

বিশ্ব ঐতিহ্য দিবসের পিছনের গল্প :-


প্রতি বছর ১৮ এপ্রিল দিনটিকে বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস হিসেবে উদযাপন করা হয়। এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক স্মৃতি সৌধ ও স্থান দিবসও বলা হয়ে থাকে। ১৯৮২ সালে ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অন মনুমেন্টস অ্যান্ড সাইটস (আইসিএমওএস) প্রথম এই দিনটি উদযাপন করে। ১৯৮৩ সাল থেকে এটি ইউনেসকোর উদ্যোগে উদযাপিত হয়ে আসছে।

বিশ্ব ঐতিহ্য প্রথার ধারণা :-


বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজ করে ইউনেসকো। ইউনেসকোর সদস্য দেশগুলি ১৯৭২ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য কনভেনশন গ্রহণ করে। বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত স্থানগুলির যত্ন নিতে এবং এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে এমন স্থানগুলি খুঁজে বের করতে দেশগুলিকে কী করতে হবে, তা এই চুক্তিতে বলা হয়েছে। ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসে ভারত এই কনভেনশনের অঙ্গ হয়। বর্তমানে ভারতে মোট ১,২২৩টি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। এর মধ্যে ৯৫২টি সাংস্কৃতিক, ২৩১টি প্রাকৃতিক এবং ৪০টি মিশ্র। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত বিশ্বের ১৯৬টি দেশ এই কনভেনশন গ্রহণ করেছে।

বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান : ভবিষ্যতের সংরক্ষণ :-


বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলি পৃথিবীর এমন সব বিশেষ স্থান, যেগুলি সমগ্র মানবতার কাছেই অত্যন্ত মূল্যবান। ইউনেসকোর আন্তর্জাতিক চুক্তি দ্বারা এগুলি সংরক্ষিত।

ভারত বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় তার উপস্থিতি ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে অসমের “ময়দাম : আহম রাজবংশের ঢিপি-সমাধি ব্যবস্থা”-এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ভারতের ৪৩টি স্থান বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকার অন্তর্ভুক্ত। আরও ৬২টি স্থান ইউনেসকোর সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে। ১৯৮৩ সালে আগ্রা দুর্গ প্রথম বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এর পর ক্রমশ তাজমহল, অজন্তা ও ইলোরার গুহা প্রভৃতি তালিকায় স্থান পেয়েছে।

ভারতের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে সরকারের উদ্যোগ :-


ভারত তার বিপুল সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় বেশকিছু অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। এই উদ্যোগগুলি দেশের কালজয়ী সম্পদ ও ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

 

• প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ পুনরুদ্ধার : ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ দেশের সাংস্কৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে অঙ্গীকারবদ্ধ। ১৯৭৬ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সরকার মোট ৬৫৫টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বিদেশ থেকে উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে ৬৪২টি উদ্ধার করা হয়েছে ২০১৪ সালের পরে।

 

• ঐতিহ্য দত্তক প্রকল্প : ২০১৭ সালে এই কর্মসূচির সূচনা হয়েছিল। ২০২৩ সালে এর দ্বিতীয় সংস্করণ চালু হয়। এর আওতায় সরকারি ও বেসরকারি গোষ্ঠীগুলি তাদের কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের অর্থ ঐতিহ্য সংরক্ষণে ব্যবহার করে। এপর্যন্ত ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের সঙ্গে বিভিন্ন অংশীদার সংগঠনের ২১টি সমঝোতাপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে।

 

• বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৬তম অধিবেশন : কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীন ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ ২০২৪ সালের ২১ থেকে ৩১ জুলাই হিন্দিতে বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪৬তম অধিবেশনের আয়োজন করে। অধিবেশনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে ১৪০টিরও বেশি দেশের প্রায় ২,৯০০ জন প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিলেন। এর মাধ্যমে বিশ্ব ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভারতের ভূমিকা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

 

• জাতীয় গুরুত্বের সৌধ নির্মাণ : ভারতে ৩,৬৯৭টি প্রাচীন স্মৃতিসৌধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। এগুলি জাতীয় গুরুত্বের স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বির সর্বেক্ষণের। এই সব স্থানে যাতে যাতায়াতের পথ, বসার ব্যবস্থা ভিন্ন ভাবে সক্ষম দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা, লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো, স্মারক বিপণী প্রভৃতি থাকে তা সুনিশ্চিত করার দায়িত্বও ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের ওপর নস্ত।

 

• ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলির পুনরুজ্জীবন ও পুনরুন্নয়ন : ভারতে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থানের পুনরুজ্জীবনের জন্য সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বারাণসীতে কাশী বিশ্বনাথ করিডর, উজ্জ্বয়নে মহাকাল লোক, গুয়াহাটিতে মা কামাখ্যা করিডর তীর্থযাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়ানোর পাশাপাশি পর্যটনের প্রসারে সহায়ক হয়েছে। চারধাম সড়ক প্রকল্প এই পবিত্র স্থানের যোগাযোগের উন্নতি ঘটিয়েছে। এছাড়া সোমনাথ ও কর্তারপুর করিডরের প্রকল্পগুলি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ভক্তদের সুবিধা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।

 

• অবশ্যদ্রষ্টব্য পোর্টাল : ভারতের অবশ্যদ্রষ্টব্য স্মৃতিসৌধ ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলি তুলে ধরতে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ একটি পোর্টাল চালু করেছে। এখানে বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান ও ইউনেসকোর সম্ভাব্য তালিকা সহ প্রায় ১০০টি উল্লেখযোগ্য স্থান রয়েছে। এই স্থানগুলির ইতিহাস ও বিশদ তথ্য asimustsee.nic.in এই পোর্টালে পাওয়া যাচ্ছে।

 

• ভারতে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ডিজিটাইজেশন : ২০০৭ সালে ন্যাশনাল মিশন অন মনুমেন্টস অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিজ (এনএমএমএ) স্থাপন করা হয়েছে। এর কাজ হল ভারতের ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন নিদর্শন ও স্থানগুলির যাবতীয় তথ্য ডিজিটাইজ করা। এপর্যন্ত ১২.৩ লক্ষ প্রাচীন নিদর্শন এবং ১১,৪০৬টি ঐতিহ্যবাহী স্থানের তথ্য নথিবদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৪-২৫ সালে এই মিশনের জন্য ২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হয়েছে।

• ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা : ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর সরকার অহমিয়া, মারাঠি, পালি, প্রাকৃত এবং বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। এর ফলে, ধ্রুপদী ভাষার সংখ্যা বেড়ে হল ১১। এই উদ্যোগ বৈচিত্রপূর্ণ সুপ্রাচীন ভাষাগত ঐতিহ্য রক্ষায় ভারতের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

 

• ভারতের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষামূলক যাদুঘর : কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অমিত শাহ ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি ভাদনগরে প্রত্নতাত্ত্বিক পরীক্ষামূলক যাদুঘরের উদ্বোধন করেছেন। ১২,৫০০ বর্গমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা এই যাদুঘর নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ২৯৮ কোটি টাকা। এখানে ৫ হাজারেরও বেশি শিল্পকর্মের মাধ্যমে ভাদনগরের আড়াই হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

 

• হুমায়ুনের সমাধি বিশ্ব ঐতিহ্য স্থান যাদুঘর : ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই দিল্লিতে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হুমায়ুনের সমাধিতে ১০ হাজার বর্গফুটের এক অত্যাধুনিক যাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এতে সেখানকার সমৃদ্ধ ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতি ফুটে উঠেছে।

 

• এমওডাব্লুসিএপি রেজিস্টারে ভারতের সাহিত্যগত মাইলফলক : এক ঐতিহাসিক উদ্যোগে ভারতের তিনটি সাহিত্য সম্পদ রামচরিতমানস, পঞ্চতন্ত্র এবং সহৃদয়লোকালোচনা ২০২৪ সালের এশিয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিশ্ব কমিটির (এমওডাব্লুসিএপি) রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৮ মে মঙ্গোলিয়ায় এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে, ভারতের সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিশ্বের স্বীকৃতি আদায় করলো।

উপসংহার :-


বিশ্ব ঐতিহ্য দিবস আমাদের মনেকরিয়ে দেয় ঐতিহ্য রক্ষা এক যৌথ দায়িত্ব। সুপ্রাচীন সৌধ থেকে শুরু করে কালজয়ী সাহিত্য ভারত তার সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই উদ্যোগ আমাদের শিক্ষা দেবে, প্রাণিত করবে এবং আগামী প্রজন্মকে ঐক্যবদ্ধ রাখবে।

Related posts

জেএনসিএএসআর প্রতিষ্ঠানের গবেষকরা ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্য চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন

E Zero Point

মধ্যপ্রদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৫টি মহাসড়ক প্রকল্পের শিলান্যাস

E Zero Point

স্থান ও কাল নিউট্রিনোর দোলনকে প্রভাবিত করে

E Zero Point

মতামত দিন