05/10/2022 : 6:29 PM
BREAKING NEWS
অন্যান্য

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রোজার ভূমিকা

বিশেষ প্রতিবেদনঃ রোজা রেখে নির্ধারিত সময়ের জন্য খাওয়াদাওয়া থেকে বিরত থেকে উপবাস যাপনের মাধ্যমে রোজাদার আত্মসংযমে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, যা দেহকে পূতপবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করে তোলে। রোজার দ্বারা মানুষের শারীরিক সুস্থতা হাসিল হয় ও মানসিক কল্যাণ সাধিত হয়। রোজা একই সঙ্গে মানবদেহে রোগ প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। রোজা পালনের ফলে দেহের রোগজীবাণু জীর্ণ অন্ত্রগুলো ধ্বংস হয় এবং নার্ভ-সংক্রান্ত রোগের উপকরণ ইউরিক অ্যাসিড বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়। পরিমিত পানাহার ও আত্মসংযম তথা খাদ্যকে আয়ত্ত করার মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়; তাই সুস্বাস্থ্যের জন্য রোজা রাখতে বলা হয়েছে। পরিমিত পানাহার সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর তোমরা আহার করবে ও পান করবে, কিন্তু অপচয় করবে না; নিশ্চয়ই আল্লাহ অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ৩১)
রোজা জনস্বাস্থ্যের বিরাট উপকার সাধন করে। সিয়াম সাধনায় দেহের পরিপাকযন্ত্র একপ্রকার পরিশুদ্ধি লাভের অবকাশ পায়। একনাগাড়ে কিছুদিন রোজার মাধ্যমে পরিপাকযন্ত্রকে খালি রাখলে দেহের অভ্যন্তরে সঞ্চিত ‘টক্সিন’ নামের এক প্রকার বিষাক্ত রস নিঃশেষ হয়ে যায় এবং উত্তম রস দেহের মধ্যে কোনো প্রকার ক্ষতিসাধনের অবকাশ রাখে না। রোজার উপবাস রক্তের কোলেস্টেরল ও হূৎপীড়ার আশঙ্কামুক্ত রাখে। পাকস্থলীসংক্রান্ত রোগ সিয়াম সাধনার ফলে স্বাভাবিকভাবেই উপশম হওয়ার সুযোগ পায়। রোজা একই সঙ্গে দেহে রোগ প্রতিষেধক ও প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। রোজা পালনের ফলে দেহে রোগজীবাণুবর্ধক ও জীর্ণ জীবাণুগুলো ধ্বংস হয়। রোজাদারের শরীরে পানির পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার দরুন চর্মরোগ বৃদ্ধি পায় না। রোজার সামগ্রিক প্রভাব জনস্বাস্থ্যের ওপর ধীরভাবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে এবং শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এ ছাড়া উপবাস কিডনি ও লিভারের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং শরীরে নতুন জীবনীশক্তি সৃষ্টি করে রোজাদারের মনে সজীব অনুভূতি এনে দেয়। এ জন্য দেহের ভেতর সঞ্চিত হরেক রকম বিষাক্ত উপাদান অতি সহজে ও দ্রুতগতিতে দূর করার মোক্ষম উপায় হলো রোজা।
স্বাস্থ্যবিদদের কথা, ‘শরীরটাকে ভালো রাখতে চাও তো রোজা করো।’ নীরোগ, দীর্ঘজীবী ও কর্মক্ষম সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে বছরের কতিপয় দিন উপবাসের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। খাবারের উপাদান থেকে সারা বছর ধরে মানবদেহে জমে থাকা কতিপয় বিষাক্ত পদার্থ, চর্বি ও আবর্জনা থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ ও স্বাভাবিক উপায় হচ্ছে উপবাস। রোজা রাখার ফলে দেহের অভ্যন্তরে দহনের সৃষ্টি হয় এবং শরীরের ভেতর জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থগুলো দগ্ধীভূত হয়ে যায়। উপবাসকালে শরীরের মধ্যস্থিত, প্রোটিন, ফ্যাট ও শর্করাজাতীয় পদার্থসমূহ পাচিত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোতে পুষ্টি বিধান হয়। এটি হচ্ছে শরীর বিক্রিয়ার এক স্বাভাবিক পদ্ধতি। রোজা এ পদ্ধতিকে সহজ, সাবলীল ও গতিময় করে। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোজা হচ্ছে একটি ঢালের ন্যায়।’ (বুখারি)
মানবদেহের রোগ নিরাময়ের ক্ষেত্রে রোজা অনেক উপকার সাধন করে। উপবাসের মাধ্যমে রক্তসঞ্চালন দ্রুত হয়, ফলে ত্বকের নিচে সঞ্চিত চর্বি, পেশির প্রোটিন, গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারের কোষসমূহ আন্দোলিত হয়। খাদ্যাভাব বা আরাম-আয়েশের জন্য মানবদেহের যে ক্ষতি হয়, রোজা তা পূরণ করে দেয়। তাই বর্তমানে অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি, যেমন হূদেরাগ, চর্মরোগ, বাত, কোষ্ঠকাঠিন্য, স্থূলকায় রোগী, জ্বর, শ্বাসকষ্ট রোগ ইত্যাদি নিরাময়ে রোজা রাখার উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। রোজা এসব রোগের কষ্ট দূর করে এবং অনেক ক্ষতিকর টক্সিনের বিষক্রিয়া থেকে শরীর রক্ষা পায়। এটি অতি স্বাভাবিক ও অত্যন্ত কার্যকর পন্থায় দেহের অভ্যন্তরে বিধৌত ও পরিচ্ছন্ন হয়। তাই হূদয়ের স্বচ্ছতা হাসিলে পরিমিত পানাহার ও স্বল্প খাদ্য গ্রহণের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।
মাহে রমজানে অনেকে চিন্তিত হয়ে পড়েন এই ভেবে যে, রোজা রাখলে নাকি শরীর-স্বাস্থ্য নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু রোজায় জনস্বাস্থ্য বিনষ্ট হয়ে গেছে বা ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হয়ে কোনো রোজাদারের মৃত্যু হয়েছে, এমন ঘটনা ঘটেনি। রমজান মাসের পর দেখা যায়, যার যেমন স্বাস্থ্য, ঠিক তেমনই আছে। রোজা শুরুর কিছুদিনের মধ্যে রোজাদার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে নিতে পারেন। কারণ, ক্ষুধার চিরাচরিত অভ্যাস রোজা শুরুর প্রথম কয়েক দিনই একটু যন্ত্রণা দেয় মাত্র। পরে এটাও অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এরপর রোজাদার প্রতিদিনই মানসিকভাবে নিজেকে প্রাণময়, চঞ্চল ও উৎফুল্ল মনে করে। রোজা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং মঙ্গলজনকই বটে। তবে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য খাবার হতে হবে পুষ্টিকর ও পরিমিত। রোজার সময় মানবদেহের বিপাক ক্রিয়া বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে কিছুটা পরিবর্তিত নয় বলে সহজপাচ্য, অর্থাৎ সহজে হজম হয় এজাতীয় খাবার গ্রহণ করা উচিত।
সূর্যাস্তের পর রাত শুরুর প্রাক্কালে গোধূলিলগ্নে রোজা শেষ করার মধ্যে মানসিক, আধ্যাত্মিক এমনকি শারীরিক নিগূঢ় রহস্য ও তাৎপর্য রয়েছে। সেহির থেকে ইফতার পর্যন্ত বেশ অনেকটা সময় পরে খাদ্য গ্রহণে সতর্ক থাকলে শারীরিকভাবে সুস্থ থেকে রোজা পালন করা সম্ভব। রোজার মাসে খাবার সাধারণত তিনবার খাওয়া হয়—ইফতার, কিছুক্ষণ পরে সন্ধ্যারাতের খাবার ও সেহির। স্বাস্থ্য খাবারের ওপর নির্ভরশীল, খাদ্য গ্রহণের সময় পরিবর্তনের দরুন স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, তাই রমজান মাসে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্য গ্রহণের ব্যাপারে সচেতন হওয়া দরকার। প্রকৃতপক্ষে রোজা কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুস্বাস্থ্যের সহায়ক। ডায়াবেটিস, পেপটিক আলসার, উচ্চ রক্তচাপ এবং অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীরা নিয়মিত ওষুধ সেবন করে রোজা রাখতে পারেন। দেহ সুস্থ থাকলে মন ভালো থাকে আর মন ভালো থাকলে ইচ্ছামাফিক আল্লাহর ইবাদত করতে পারবেন। সুতরাং, স্বাস্থ্যসচেতন হয়ে পরিমিত পানাহার ও পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করে রমজান মাসে রোজাদারদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা মোটেই কঠিন ব্যাপার নয়। (সূত্রঃ ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান)

Related posts

রমজানের জনপ্রিয় গানঃ ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ

E Zero Point

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তির খণ্ডঘোষের বাদুলিয়া গ্রামটিকে পুলিশ সিল করে দিল

E Zero Point

আমফান ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে মেমারি শহর বিজেপি

E Zero Point

মতামত দিন