25/09/2022 : 11:12 PM
BREAKING NEWS
Breaking Newsআমার দেশআমার বাংলা

৭৩ তম প্রজাতন্ত্র দিবসঃ কিন্ত প্রশ্ন একটাই – গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভ কেন ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে?

জিরো পয়েন্ট বিশেষ প্রতিবেদন২৬ জানুয়ারি ২০২২:

জ্যোতি প্রকাশ মুখার্জ্জী


১৭৫৭ সাল। নিজ দলের মিরজাফর সহ আরও অনেকের বেইমানির জন্য পলাশীর প্রান্তরে পরাজয় ঘটে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌল্লার। মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি জয়লাভ করে। এই জয়লাভের পরই ধীরে ধীরে ইংরেজরা সমগ্র ভারতবর্ষ জুড়ে নিজেদের যে প্রাধান্য বিস্তার শুরু করে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর ইংরেজ শাসনের ভিত দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে থাকে। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির পরিবর্তে ভারতের শাসনভার যায় মহারানি ভিক্টোরিয়ার হাতে। তারপর থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হয় স্বাধীনতা লাভের জন্য লড়াই।

১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মূলত কংগ্রেস নেতৃত্বের হাত ধরেই শুরু হয় সংগঠিত স্বাধীনতা আন্দোলন। যদিও পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের অভিমুখ নিয়ে জাতীয় কংগ্রেস নরমপন্হী ও চরমপন্হী – এই দুটো ভাগে ভাগ হয়ে যায়। পথ আলাদা হলেও সবার লক্ষ্য ছিল একটাই – দেশের স্বাধীনতা। দেশের একদল তরতাজা যুবক স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। চরম অত্যাচার সহ্য করেও, দু’একজন ছাড়া, কেউই মূল লক্ষ্য থেকে পেছিয়ে আসেনি। কারও স্হান হয় অন্ধকার কারাগৃহে, কারও হয় দ্বীপান্তর, কেউবা ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান গেয়ে যান।

স্বাধীনতার রঙ্গমঞ্চে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ও মহাত্মা গান্ধী প্রবেশের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। সমগ্র ভারতবাসী ইংরেজদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে। গান্ধীজীর অহিংস অসহযোগ আন্দোলন বা নেতাজীর আজাদ হিন্দ বাহিনীর মরণপণ সংগ্রাম ইংরেজ শাসনের ভিত দুর্বল করে দেয়। ইংরেজরাও বুঝতে পারে ভারতে তাদের দিন শেষ হয়ে আসছে।

এদিকে ১৯২৯ সালে পণ্ডিত জওহর লাল নেহরুর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনে একটি প্রস্তাব পাস হয়। তাতে বলা হয় ইংরেজ সরকার যদি ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারির মধ্যে ভারতকে ‘ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস’ এর মর্যাদা না দেয়, তাহলে ভারত নিজেই নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন বলে ঘোষণা করবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ইংরেজ সরকার কংগ্রেসের এই দাবি নিয়ে কোনো সদর্থক উত্তর না দিলে কংগ্রেস সম্পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্য পূরণের জন্য সক্রিয় আন্দোলন শুরু করে। ১৯২৯ সালের ৩১ সে ডিসেম্বর জওহর লাল নেহরু লাহোরে প্রথমবার তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করেন এবং সেই দিনই ১৯৩০ সালের ২৬ সে জানুয়ারী দিনটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঘোষিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঐ দিনটি পরাধীন ভারতে প্রথম স্বাধীনতা দিবস হিসাবে পালন করা হয় এবং পরবর্তী ১৭ বছর ধরে অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দিনটিকে ‘পূর্ণ স্বরাজ’ দিবস হিসাবে পালন করা হয়।

যাইহোক ভারতীয়দের অদম্য এবং নাছোড়বান্দা আন্দোলনের কাছে শেষ পর্যন্ত ইংরেজ সরকার হার মানতে বাধ্য হয়। লর্ড মাউন্টব্যাটন ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট দিনটি ভারতকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করার জন্য বেছে নেয়। ঐদিন স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে দ্বিখণ্ডিত ভারতবর্ষ।

দেশ স্বাধীন হলেও দেশকে পরিচালনা করার মত ভারতের নিজস্ব কোনও সংবিধান ছিল না। প্রায় ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিন ধরে চলেছিল সংবিধান রচনা করার কাজ । অবশেষে সেই সংবিধান রচিত হয় এবং ১৯৪৯ সালের ২৬ শে নভেম্বর গণপরিষদ কর্তৃক ভারতের সংবিধান  অনুমোদিত ও গৃহীত হয়। সমস্যা দাঁড়ায় এক জায়গায় – ১৫ ই আগষ্ট দেশ স্বাধীন হয়।

অন্যদিকে ১৯৩০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি পরাধীন ভারতে প্রথম তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করা হয়। দুটি দিনই প্রতিটি ভারতবাসীর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ। স্বাধীনতা দিবসের দিনটির কাছে ২৬ শে জানুয়ারি দিনটির গুরুত্ব যাতে কমে না যায় তারজন্য সংবিধান রচয়িতারা ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি দিনটি বেছে নেন এবং ঐদিন ভারতের সংবিধান চালু হয়- পরাধীন ভারতবর্ষ থেকে আধুনিক গণতন্ত্রে রূপান্তরিত হওয়ার দিন।

সংবিধান অনুযায়ী ভারত একটি  ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ নাম হয় সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের পরিবর্তে ভারতীয় সংবিধান এবং ভারতীয়দের  দ্বারা দেশ পরিচালিত হতে থাকে। পূরণ হয় স্বাধীনতাকামী ভারতবাসী তথা বিপ্লবীদের স্বপ্ন।

প্রজাতন্ত্র অথবা সাধারণতন্ত্র শব্দ যুগল প্রতিটি ভারতবাসীর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। মিশে আছে রক্তের সঙ্গে। অর্থটা ‘লোকের জন্য এবং লোকের দ্বারা’ হলেও প্রজাতন্ত্র শব্দের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ভাবে ‘রাজা’ শব্দের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কারণ রাজার সঙ্গে প্রজা শব্দটা জড়িয়ে আছে। যেখানে একজনের কাছে আছে শাসন ক্ষমতা এবং বাকিরা তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কিংবা শোষিত !
অন্যদিকে গণতন্ত্রের ‘গণ’ শব্দের অর্থ হলো আপামর সাধারণ ভারতবাসী। গণতন্ত্র মানে তাই সাধারণের জন্য, সাধারণের দ্বারা- of the people, by the people, for the people.

সত্যিই কি ভারত গণতান্ত্রিক দেশ? জনগণের ভোটে সরকার নির্বাচিত হয় ঠিকই তারপর গণতন্ত্রের মূল শর্তগুলো কি পালিত হয়? আইনসভা ছাড়া গণতন্ত্রের বাকি তিনটে স্তম্ভ কেন ক্রমশ দুর্বল হতে থাকে? প্রশ্ন করলেই শাসক দলের নেতারা কেন ক্ষুব্ধ হয়? নির্বাচনের পর বিরোধী দলের কর্মী-সমর্থকদের উপর আক্রমণের খাড়া নেমে আসে কেন? অথবা শাসক দলের বিরুদ্ধে কথা বললে কেন তার গায়ে দেশদ্রোহী তকমা এঁটে দেওয়া হয়? কেন নিরপেক্ষ তথা সবার হয়ে ওঠার পরিবর্তে প্রশাসনে শাসক দলের দাপট দেখা যায়? এখনো রাজনীতিতে কেন অর্থবলী বা বাহুবলীদের প্রাধান্য বেশি দেখতে পাওয়া যায়? কেন সংবিধান গৃহীত হওয়ার বাহাত্তর বছর পরেও এদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের দু’বেলা পেটের ভাত জোটেনা অথবা নিরক্ষর থেকে যায়? কেন সাধারণ মানুষের পরিবর্তে কর্পোরেট সেক্টরগুলো সরকারের কাছে বেশি গুরুত্ব পায়?

এরকম হাজারো প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে উদিত হলেও ২৬ জানুয়ারি দিনটি আমাদের গর্বকে পূর্ণ করে, সম্পূর্ণ স্বাধীনতার অনুভূতি দেয়। তাইতো সারা দেশে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদা ও আড়ম্বরের সাথে পালিত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি দেশ পেয়েছিল পূর্ণ স্বাধীনতা।

অনেক জ্বলন্ত প্রশ্নের অমীমাংসিত উত্তর নিয়ে বর্তমান বছরে ভারত তার ৭৩ তম প্রজাতন্ত্র দিবস পালন করতে চললেও প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশ কবে হবে? কবে আমরা স্বাধীনভাবে রাজনীতি চর্চা বা মত প্রকাশ করার অধিকার পাব? কবে দেশ হবে সম্পূর্ণ দূর্নীতিমুক্ত? দল যখন ক্ষমতায় থাকেনা তখনও তো দল চলে।

তাহলে দল ক্ষমতা লাভ করলেই কেন উঠবে দূর্নীতির অভিযোগ? মুষ্টিমেয় দূর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের কাছে গণতন্ত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য কি হেরে যাবে? ৭৫ তম স্বাধীনতা দিবসের বছরে দেশ তথা প্রতিটি রাজ্যের শাসক ও বিরোধী গোষ্ঠীর সৎ নেতারা কি ভেবে দেখবেন?  দেশের ৭৩ তম গণতন্ত্র দিবসে কি নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখবে ভারতবাসী?

 

Related posts

রাজ্য জুড়ে গ্রামীন সম্পদ কর্মী সংগঠনের অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্না কর্মসূচি

E Zero Point

বিজেপি তৃণমূল সংঘর্ষে উত্তপ্ত ভাতার

E Zero Point

বায়ুসেনা প্রধান কলেজ অফ এয়ার ওয়ারফেয়ারে

E Zero Point

মতামত দিন