30/09/2022 : 11:49 AM
BREAKING NEWS
সাহিত্যসাহিত্য সংবাদ

ফুটপাতের পানের দোকানে জন্ম নিলো একডজন উপন্যাস

জিরো পয়েন্ট নিউজ রাজকুমার দাস, কলকাতা, ১৫ জানুয়ারি ২০২২:


সময়টা ১৯৯৮। কলকাতার পথে পথে এক মেধাবী ছাত্র ঘুরে বেড়াচ্ছে চাকরির সন্ধানে। উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে কলেজে
ভর্তি হয়েছিল সে। আর্থিক কারণে কলেজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে। এখন তার একটা চাকরির খুব দরকার। পরিচিত-অপরিচিত অনেক মানুষের কাছে যাচ্ছে সে। না, কেউ তাকে খেয়েপরে বাঁচার মতো একটা চাকরি বা কাজ কিছুই দিতে পারছে না।
এভাবে কতদিন শুধু একটা কাজের জন্য ঘুরে বেড়ানো যায়! শেষে সে সিদ্ধান্ত নিল বাড়ির কাছে বাজারে একটা পান-বিড়ি-সিগারেটের ছোট্ট দোকান দেবে। কয়েক জন বন্ধুর সহায়তায় সে খুলে ফেলল দোকান। দোকান চলতে শুরু করল। তার ভাত-কাপড়ের সমস্যা মিটল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্য জায়গায়। ছোটবেলা থেকেই তার পড়া আর লেখার নেশা। দিনে চৌদ্দ-পনেরো ঘন্টা দোকান চালাতে গিয়ে পড়া-লেখা কিছুই হচ্ছে না। এখন আবার পড়া-লেখা শুরু করতে গেলে দোকানটা বন্ধ রাখতে হয়। আর দোকান বন্ধ রাখলে তার ও তার পরিবারের ভাত-কাপড় সবই যে বন্ধ হয়ে যাবে। অনেক ভেবেই সে সিদ্ধান্ত নিল দোকানে বসেই লিখবে আর পড়বে।


শুরু হল তার অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অসম লড়াই। হাতে তুলে নিল বই আর কাগজ-কলম। খদ্দের এলে বইখাতা কোল থেকে নামিয়ে রেখে খদ্দেরের চাহিদা মেটায়। খদ্দের চলে গেলেই আবার কোলে তুলে নেয় বইখাতা। প্রতিটি পেশার মানুষের সম্পর্কে আমাদের সমাজের গতে বাঁধা কিছু ধারণা আছে। একশো শতাংশ না হলেও নিরানব্বই শতাংশ ক্ষেত্রে তা মিলে যায় বলে গতে বাঁধা দৃশ‍্যের বাইরে কিছু দেখলেই তা আমাদের চোখে দৃষ্টিকটু মনে হয়। আমরা তাকে একেক জন একেকটা নামে অভিহিত করি। কেউ পাগলামো বলি। কেউ বলি লোক হাসানো। ফুটপাতের ছোট্ট দোকানে বসে ছেলেটাকে শুধু লিখতে-পড়তেই তো দেখল না সকলে! দেখল, কয়েক জন বন্ধুকে জুটিয়ে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে। পত্রিকা বের করতে। বড় বড় পত্রিকায় ছাপা অক্ষরে নিজের নাম ও লেখা দেখাতে। সেজন্য অনেকেই ব‍্যঙ্গ-বিদ্রুপ করা শুরু করে দিল। ভাত না দিতে পারলেও এদেশে যে আজও কিল মারার গোঁসাই সাজা সোজা। এক সময় আর্থিক কারণে তাদের সেই পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেল। পরিবারের সদস্য বাড়ার কারণে নেমে এল আরও দারিদ্র্য আরও অভাব-অনটন। ছেলেটা কিছুতেই দমল না। লড়াই চলল তার বছরের পর বছর।


এই দোকানে বসে পড়েই সে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক হল। এই দোকানে বসে পড়েই সে বাংলা সাহিত্যে মাস্টার ডিগ্রিও অর্জন করল। তবুও তার লড়াই সবারই যেন চোখ এড়িয়ে গেল। পাশে পেল না সে কোনও সুহৃদ। পেল শুধু অবজ্ঞা আর অবহেলা। না, সে তাতেও দমল না। দোকানের সামান্য রোজগারকে সম্বল করেই সে চালিয়ে গেল তার লক্ষ্যে পৌঁছনোর লড়াই। বাইশ বছর আগে আপনারা ঠিক যেমনটা দেখেছিলেন, আজও বেহালার মদনমোহন তলা বাজারে গেলে দেখতে পাবেন, ফুটপাতের এক ছোট্ট দোকানে বসে এক জন হয় লিখছেন, না হয় পড়ছেন। তাঁর দোকান,তাঁর চেহারা আর তাঁর পোশাক-আশাক দেখলে তাঁকে অতি সাধারণ এক জন মানুষ বলেই মনে হবে। কিন্তু তাঁর নাম শুনলে আপনি নিশ্চয়ই চমকে উঠবেন।


তাঁর লেখা গল্প-কবিতা আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দমেলা, সানন্দা, দেশ, নবকল্লোল, শুকতারা, বর্তমান, প্রতিদিন, সাপ্তাহিক বর্তমান, শিলাদিত্য, কৃত্তিবাসের মতো বাংলা সাহিত‍্যের প্রথম সারির বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আপনারা পড়েছেন। ইতিমধ্যেই তাঁর ছোটদের জন্য লেখা পাঁচটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। পারুলমাসির ছাগলছানা, নোটন নোটন পায়রাগুলি, ইলিশখেকো ভূত, কচুরিপানার ভেলা ও ঝিনুককুমার। যা উচ্চ প্রশংসিত সাহিত্যের গুণগত মানের বিচারে। হ‍্যাঁ, আজও ফুটপাতের একটা ছোট্ট দোকানে রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে দোকানদারির পাশাপাশি মানুষের ব‍্যঙ্গ-বিদ্রুপ উপেক্ষা করে সাহিত্য সাধনা করে চলেছেন এক সাহিত্য সাধক। তাঁর নাম পিন্টু পোহান। যাঁর ঠিকানা এখনও বেহালার মদনমোহন তলা বাজারের ফুটপাতের একটি ছোট্ট দোকান।


বেহালা ও টালিগঞ্জের সংযোগ তৈরি করেছে যে পথ, বর্তমানে তাকে ভাগ করা হয়েছে বিরেন রায় রোড, রাজা রামমোহন রায় রোড… প্রভৃতি নামে। গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকারী পথ হওয়ার জন্য এই পথে গাড়ি চলাচল এখন অনেক বেশি। সাধারণ মানুষকে রাস্তা পার হতে হলে অপেক্ষা করতে হয়। তা ছাড়া গাড়ির হর্ন আর ইঞ্জিনের শব্দে কানে তালা পড়ার জোগাড় হয়।
এই রাজা রামমোহন রায় রোডেই আবার মদনমোহন তলা বাজার। সেই বাজারে সকাল থেকেই যে চিৎকার শুরু হয় তাও কানে তালা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য কম নয়।  এই বাজারেই দেখতে পাবেন  তিন ফুট বাই তিন ফুটের ছোট্ট একটা টিনের গুমটির পান দোকানে, বেলা একটু বাড়লেই যা হয়ে যায় আগুনের মতো, সেই দোকানে বসে বাজারের ক্রেতা-বিক্রেতার চিৎকার চেঁচামেচি, পথের কানে তালা ধরানো গাড়িঘোড়ার হর্ন ও ইঞ্জিনের শব্দকে উপেক্ষা করে একমনে লিখে চলেছেন একজন সাহিত্য সেবক।
এক নয় দুই নয় দীর্ঘ বাইশটা বছর তিনি এভাবেই লিখে চলেছেন।

তিনি লেখক পিন্টু পোহান। জন্ম ১৯৭৮, কলকাতার এক নিম্নবিত্ত পরিবারে। পিতা পূর্ণচন্দ্র পোহান। মা উজ্জ্বলা দেবী। পাঁচ ভাইবোনের মধ‍্যে কনিষ্ঠ। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু জয়শ্রী হরিচরণ বিদ‍্যাপীঠে, পরে বড়িশা শশীভূষণ জনকল্যাণ বিদ‍্যাপীঠ থেকে মাধ্যমিক ও সোদপুর শ্রীমন্ত বিদ‍্যাপীঠ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর কলেজে ভর্তি হয়েও আর্থিক কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বন্ধ রেখে জীবন ও জীবিকার পথের সন্ধানে বের হতে হয়। দিনের পর দিন পথ হাতড়ে বেরিয়ে শেষে নিরাশ হয়ে বেহালার মদনমোহন তলায় ফুটপাতে এই অস্থায়ী দোকান খুলে শুরু করেন নতুন করে জীবন সংগ্রাম। লেখক হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর ছেলেবেলা থেকেই। লেখার অভ‍্যাসও ছিল তাঁর সেজন‍্যই শুধুমাত্র পাঠ‍্যপুস্তক নয়, পাঠ্যপুস্তকের বাইরে প্রচুর গল্প-কবিতার বই পড়তেন। দারিদ্রসীমার নিচে বাসকরা একটি পরিবারের ছেলে, যার জানার আগ্রহ ছিল অসীম, পাশে সেভাবে কাউকে না পেলেও পেয়েছিল স্থানীয় একটি গ্রন্থাগার। পেয়েছিল দু’একটি কালোয়ারের দোকান, যেখানে কেজি দরে বই পাওয়া যায়। সেগুলোর সাহায্য সম্বল করেই এগিয়ে ছিল তার সাহিত্য সাধনা।
তিনি দোকান দিয়ে আর্থিক অভাব-অনটনের সমস্যা কিছুটা মেটাতে পারলেন বটে, কিন্তু দেখা দিল অন্য সমস্যা। মাসের পর মাস দোকানদারি করেই কেটে যায়। না পারেন নতুন কোনও বই পড়তে , না পারেন নতুন কোনও গল্প লিখতে।
এদিকে আবার দোকান বন্ধ রেখে সাহিত্য চর্চা করতে গেলে যে তিনি আরও আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়বেন সেই অপ্রিয় সত‍্যটাও তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে গিয়েছেন।
অনেক ভাবনা-চিন্তা করে অবশেষে তিনি একটা ব‍্যবস্থা করে ফেললেন কিছুদিনের মধ‍্যে। দোকানে বসেই তিনি লিখতে আর পড়তে শুরু করলেন। বিষয়টা অনেকেই ভালো চোখে নিল না।

তাঁর চারপাশের তথাকথিত সভ‍্য সমাজের অনেক সদস‍্যর মনে হল, এ নিছক পাগলামি ছাড়া কিছু নয়। তাঁরা আর স্থির হয়ে থাকতে পারলেন না। শুরু করলেন ব‍্যঙ্গবিদ্রুপ। হাজারো মানুষের ব্যঙ্গবিদ্রুপকে উপেক্ষা করে পথের পাশে তাঁর সেই ছোট্ট দোকানে কাজের ফাঁকে ফাঁকেই তিনি চালিয়ে গেলেন তাঁর সাহিত্যচর্চা। লেখার ক্ষেত্র বাড়িয়ে নেন। স্থানীয় কয়েকটি পাক্ষিক সংবাদপত্রে সাংবাদিকতা করার পাশাপাশি নিয়মিত গল্প-কবিতা লিখে পাঠাতে শুরু করেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সারির সমস্ত পত্রপত্রিকায়।
একটি স্কুলের ম‍্যাগাজিনে বন্ধুর নামে যার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়েছিল, শুকতারার গল্প প্রতিযোগিতায় ভাল গল্প লেখার জন্য যার কখনও কখনও নাম প্রকাশিত হত, তাঁর লেখাই প্রকাশিত হতে শুরু করল আনন্দবাজার পত্রিকা, আনন্দমেলা, সানন্দা, দেশ, নবকল্লোল, শুকতারা, কৃত্তিবাস, শিলাদিত্য… বাংলা সাহিত‍্যের প্রথম সারির বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়। তিনি বাংলা সাহিত্যে এমএ হন সেই দোকানে বসেই পড়াশোনা করে। বর্তমানে তিনি বাংলা সাহিত্যে এমএ। আজ তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পাঁচ।
তবু আজও কখনও যদি বেহালার মদনমোহন তলায় যান, দেখতে পাবেন, ফুটপাতের একটা ছোট্ট দোকানে রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে দোকানদারির পাশাপাশি মানুষের ব‍্যঙ্গ-বিদ্রুপ উপেক্ষা করে সাহিত্য সাধনা করে চলেছেন এক সাহিত্য সাধক। তাঁর নাম পিন্টু পোহান। শুধু একটাই আবেদন যদি কোনো সাহিত্য সংগঠন কিংবা সরকারী প্রতিষ্ঠান পিন্টু র কাছে আর্থিক সাহায্য মাধ্যমে এগিয়ে আসে তাহলে সাহিত্য সৃষ্টির এক নতুন স্টার কে আমরা খুঁজে পাবো।

Related posts

দৈনিক কবিতাঃ মেঘলাযাপন

E Zero Point

রবিবারের আড্ডা : আরণ্যক বসু || আঞ্জু মনোয়ারা আনসারী || তপন কুমার রায়

E Zero Point

দৈনিক কবিতাঃ অনুসরণ

E Zero Point

মতামত দিন