গল্প
রাঙ্গা ঠাকুমা
রণজিৎ মল্লিক (কবিরুল)
বাথরুম থেকে স্নান সেরে বেরিয়েই বারান্দায় এসে ঢুকল বৈশালী। ভিজে নাইটি , গামছাটা তারে মেলে দিয়ে রাস্তার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। রাস্তাঘাটে লোকজনের ভিড় একটু একটু করে ফিকে হয় আসছে। হাতে গোনা নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসের দোকান খোলা। বাকি সব বন্ধ। হাট বাজারও ঠিক মত বসছে না।
এখন চারিদিকে করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক। ভয় মানুষকে অনেকটাই অবশ করে দিয়েছে। মানুষ খুব বেশী সচেতন। রাত্রিরে পথে ঘাটে ভিড় আরো কম। সব সময় মাইকে প্রচার চলছে। পুলিশের পেট্রোলিং আগের থেকে আরো বেড়েছে। এদিকে বিদেশে তো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত আর মৃত ব্যক্তির সংখ্যা। মানুষ সব সময় গৃহবন্দী। ডাক্তার , নার্স , হেল্থের স্টাফদের চোখে ঘুম নেই। সব সময় রোগের সাথে লড়াই করছে।
সচেতনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মোবাইলে হোয়াটস অ্যাপ , ম্যাসেঞ্জারের ইনবক্স উপচে উঠছে। টিভি , সংবাদপত্রেও জোর কদমে চলছে প্রচার। অনবরত ভাইরাস বনাম মানুষের একটা অসম লড়াই চলছে। মানুষ নিজেরাও জানে না এ লড়াই কবে শেষ হবে।
খুব ছোটবেলাতে রাঙ্গা ঠাকুমার মুখে একবার এক মহামারীর গল্প শুনেছিল বৈশালী। তখন বৈশালীর বয়স অনেক কম। রাঙ্গা ঠাকুমা নিজে সেই প্রাণঘাতী মহামারীর ভয়বহতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তখন চিকিৎসা ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। আমাদের সমাজ এখনকার মতন এতটা সাবালক হয়নি।
ঐ মহামারীতে রাঙ্গা ঠাকুমা নিজের পরিবারের তো বটেই অনেক কাছের মানুষ পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন অনেককেই হারিয়েছিলেন। স্বজন হারানোর সেই কান্না রাঙ্গা ঠাকুমার চোখে অনেকদিন লেপ্টে ছিল। সরকার থেকে সেই সময় মানুষকে যতটা পেরেছিল সাহায্য করা হয়েছিল। মানুষ সেই সময় বেশ ভয়ে ভয়ে থাকত। তখন বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠান রামকৃষ্ণ মিশন , ভারত সেবাশ্রম সংঘ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। রাঙ্গা ঠাকুমার সেদিনের কথাগুলো আজ গল্পের মতন শোনালেও সেদিন মানুষ এখনকার মতন এতটা আধুনিক আর বিজ্ঞান মনস্ক না হয়েও ঐ ভয়ঙ্কর মহামারী বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।
সেই দুর্দিনে গরীব মানুষেরা লোকেঘর বাড়ি বাড়ি ফ্যান চেয়ে বেড়াত। রাঙ্গা ঠাকুমা সেই সময় নিজের খরচে গরীব মানুষদের রান্না করে খাওয়াতেন। তখন মানুষ অনেকটাই উদার ভাবাপন্ন আর পরোপকারী ছিল। একে অপরের বিপদে পাশে এসে দাঁড়াত। আজও যে মানুষ দাঁড়ায় না তা নয়। তবে খুব। এখন রাজনৈতিক স্বার্থটা বহুল পরিমাণে দেখা যায়।
ভাবতে ভাবতে কোন অতীতে হারিয়ে গিয়েছিল বৈশালী। রান্নাঘর থেকে মায়ের গলা ভেসে আসছে। মায়ের ডাকে সম্বিৎ ফিরল।
” কি রে , বিদুর কোন খবল পেলি ? দু সপ্তাহ ধরে ওর কোন ফোন আসেনি ? ছেলেটা কত দূরে সেই কোথায় কোন বিদেশে পড়ে আছে। ” সুলতা এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে থামল।
” না মা , বিদুর কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। ওর বাড়িতে বিদুর দাদাকে ফোন করেছিলাম। ওর সাথে কোন ভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ” বৈশালীর গলাতে উদ্বেগের সুর।
” খবরের কাগজে তো রোজ দেখছি রে মা। টিভিতেও চোখ রাখি। কি সব ভয়ঙ্কর সংবাদ চারিদিকে। একটা মারণ ভাইরাস সব কিছুকে স্তব্ধ করে দিল। বিদেশে তো মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। একটার পর একটা দেশে এই মারণ ভাইরাস থাবা বসাচ্ছে। আর কেড়ে নিচ্ছে হাজার হাজার প্রাণ। শুনলে ভয়ে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ” সুলতা শাড়ির খুঁট দিয়ে চোখের জলটা মুছল।
” মা , তোমার রান্না শেষ হল। এবার স্নান সেরে পুজোতে বস। অনেক বেলা হল। দেশের কথা ভাবার অনেক লোক আছে। ” বৈশালীর সুর একটু চড়ল।
” দেখেছ , মেয়ের কথা। আজকাল কিছু বলতে গেলেই মেয়ে মেজাজ দেখায়। ঠিক আছে আমি এই নিয়ে আর …… “
” মা প্লিজ ! আমি আর পারছি না। একটু থামবে। যাও নিজের কাজ কর। আমাকে একটু নিজের মতন কিছুক্ষণ একা থাকতে দাও। “
সুলতা মুখ ভার করে চলে যেতেই বৈশালী আবার দূর অতীতে নিজেকে ঠেলল। রাঙ্গা ঠাকুমা আজ নেই। তবু উনার গল্প , কাজ , আদর্শ , অনুপ্রেরণা , স্মৃতিগুলো বেঁচে আছে। রাঙ্গা ঠাকুমা না থাকলে বৈশালীর নার্সিংয়ের ট্রেনিংটা নেওয়া হতনা। আর ট্রেনিংটা ঠিক সময়ে না নিলে নার্সের চাকরিটা পেত না।
তখন কতই বা ব্য়স বৈশালীর। বারো ক্লাস পড়ছে। দাদা কলেজে সেকেণ্ড ইয়ার। বাবা নেভীতে চাকরি করত। দেশের বাইরে বাইরে চষে বেড়াত। ছ মাস ন মাসে একবার বাড়ি আসত।
একবার ছয় সাত মাস কি তার বেশী সময় কেটে গেলেও বাবা দেশে ফিরল না। বাড়ির সকলে বেশ চিন্তিত। দাদা বাবার হেড অফিসে গেল বাবার সংবাদ নিতে। সেখান থেকে একটা খারাপ সংবাদ নিয়ে দাদা ফিরল।
বাবার হেড অফিস থেকে সেদিন দাদাকে বলা হয়েছিল যে বাবার এইডস্ হয়েছে। আর উনি দেশে ফেরেননি। বিদেশের কোন একটা হসপিটালে উনার চিকিৎসা চলছে। দাদা সেদিন এই মর্মান্তিক সংবাদ কাউকে জানায়নি। একমাত্র বৈশালীকে বলেছিল। মা জানল অনেক পরে। ততদিনে সব শেষ।
তবে খবরটা বেশী দিন চাপা থাকেনি। বাবার এক বন্ধুর সূত্রে ঘটনাটা লোক জানাজানি হয়। পরে উনি এটাও জানান যে বাবা কোন এক বিদেশী মহিলাকে বিবাহ করে আলাদা সংসার পেতেছেন।
সেই দিন থেকে বৈশালির পরিবারকে সমাজ একটু অন্য চোখে দেখে। ভাই বোনে রাস্তাতে বেরোতে পারত না। মাও লজ্জায় কাউকে মুখ দেখাতে পারেনি। তখন থেকেই দুই ভাই বোনের লড়াই শুরু। বাবা সরে যেতেই সংসারে অভাব থাবা বসাল। সেই সময় রাঙ্গা ঠাকুমা নার্সিংয়ের কোর্সটা করার কথা বলে।বারো ক্লাস পাশ করার পরেই বৈশালী নার্সিংয়ের ট্রেনিংটা নিয়েছিল।
ট্রেনিং চলাকালীন বিদর্ভের সাথে পরিচয় হয়। বিদর্ভ একজন ডাক্তার । আর বৈশালীর নার্সিং কোর্সের কোর্স কোঅর্ডিনেটর।
বিদর্ভ বৈশালীকে দেখে ওর প্রেমে পড়ে যায়। বৈশালীর তখন ভরা যৌবন। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে প্রেমের নেশা। বৈশালীও বিদর্ভের প্রেমে সাড়া দেয়। তবে অনেক পরে। চাকরি পাবার পরে। তার আগে ওদের দূজনের মধ্যে বন্ধুত্ব বজায় ছিল।
আট বছর প্রেম চলার পরে যখন ওরা ঠিক করে বিয়ে করবে তখন একটা সামান্য ভুল বোঝাবুঝি ওদের বিবাহের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বৈশালীর বাবার ঘটনাটা বিদর্ভের ফ্যামিলি মেনে নিতে পারেনি। সেখান থেকেই ঘটনা অন্য মোড় নেই।
বৈশালীও অভিমানবশতঃ সম্পর্কের ইতি টানে।
এরপর বেশ কিছু বছর কেটে যায়। তারপর বৈশালী একদিন জানতে পারে বিদর্ভ ইটালী যাচ্ছে রিসার্চ করতে। সেই সময় বৈশালী এয়ার পোর্টে গিয়েছিল বিদর্ভের সাথে দেখা করতে। তারপর থেকেই বরফ গলতে শুরূ করে।
আবার নতুন করে ওদের পুরানো সম্পর্ক জোড়া লাগতে শুরূ করে। নিজেরাই নিজেদের ভূল বোঝাবুঝির পারদ কমিয়ে আনে। মাঝে মাঝে চিঠি , মেল , ফোনে ফোনে কথা , ম্যাসেজ এইসব চলে।
কিন্তু সব ঠিক থাকলেও করোনা ভাইরাস সব সমীকরণ বদলে দেয়। বৈশালী আজ দুই মাস ধরে বিদুর কোন সংবাদ পায়নি। ও জানে বিদু এখন আসতে পারবে না। ও কাজে ব্যস্ত। তাছাড়া ওর শরীর কেমন আছে সেটাই জানে না।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে অনেকটা বেলা বইয়ে দিল বৈশালী। আজ আবার নাইট ডিউটি আছে। করোনার তাণ্ডবে বৈশালীর কাজ অনেকটাই বেড়ে গেছে। ভাবছে আগামীকাল ডিউটি থেকে ফেরার পথে বিদুর একটা সংবাদ নিয়েই ফিরবে। মনটা কদিন থেকেই কু ডাকছে।
সারারাত ডিঊটি করে বৈশালী ঘুম ঘূম চোখে বিদুর জোনাল অফিসে যায়। সেখানে গিয়েই আজ সকালে দুসংবাদটা পায়। বিদর্ভ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে দুদিন আগেই ইটালীর মিলানে মারা গেছে। যদিও মারা যাবার আগে ও কোমাতে ছিল।
বিদর্ভ মরার আগে একটা চিঠি লিখে গেছে বৈশালীকে। সেই চিঠিতে সে বৈশালীকে এই করোনা ভাইরাসের বিরূদ্ধে লড়াইয়ে সামিল হতে বলেছে। আর এটাই বিদর্ভের লেখা বৈশালীকে শেষ চিঠি।
বিদর্ভ মৃত্যুর আগে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে অনেক লড়াই করেছে। ও আর ওর মতন বেশ কিছু প্রতিভাবান ডাক্তার মিলে করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টায় ছিল। হয়ত পারেনি। কিন্তু একদিন ওদের দেখানো পথেই বিশ্বের বিজ্ঞানী ডাক্তারেরা প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারবে।
দুদিন কেটে গেছে।
বিদর্ভ চলে যেতে বৈশালী মূষড়ে পড়েনি। বরং নতুন করে করোনা ভাইরাসের বিরূদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে। নিজের সঞ্চিত পুঁজি কাজে লাগিয়ে গরীব মানুষদের মাস্ক , স্যানিটাইজার গ্লাভস্ বিতরণ করেছে। আর ওর এই কর্মযজ্ঞে ওকে পুরোপুরি উৎসাহ জোগাচ্ছে বিদর্ভ আর ওর এই লড়াইয়ের কাণ্ডারী রাঙ্গা ঠাকুমা।
এখন টোটালি লক ডাউন চলছে। মানুষ ঘরে ঘরে ভগবানের নাম জপছে। সবাই বেশ চিন্তিত।
আজ রবিবার । গত রবিবারেই জনতা কার্ফু ঘোষণা করেছিল সরকার।
বৈশালী সকালে ঘুম থেকে উঠেই রাঙ্গা ঠাকুমার ব্যবহৃত গরদের লাল পাড় শাড়ি বের করল। শাড়িটা পরে রাঙ্গা ঠাকুমার ছবিতে প্রণাম করে হারমোনিয়ামটা বের করল। খুব জোর গলায় রবি ঠাকুরের গানটা গাইল।
” বিপদে মোরে রক্ষা কর
……. …… প্রার্থনা
বিপদে আমি না যেন করি ভয়
……. ……. ……. “
ঐ গানের কম্পাঙ্ক , অনুরণন একটু একটু করে রাজ্য , দেশের তারকাঁটার সীমানার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গোটা ভূমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ল।
শুরূ হল এক নতুন লড়াইয়ের পথ চলা।♦
রবিবারের আড্ডায় লেখা পাঠাতে হলে
zeropointpublication@gmail.com
ইমেইল এড্রেসে টাইপ করে পাঠান।
অবশ্যই লেখাটি অপ্রকাশিত হতে হবে।
