20/06/2024 : 6:55 PM
অন্যান্য

রমজানঃ তাকওয়ার আলো প্রজ্জ্বলনই রোজার উদ্দেশ্য

বিশেষ প্রতিবেদনঃ রোজার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা রোজার মাধ্যমে অন্তরের মাঝে তাকওয়া বা আল্লাহভীতির আলোক প্রজ্বলিত করেছেন।

ইমাম গাযযালী (রহ.) তার স্বভাবসুলভ দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সিয়ামের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আখলাকে ইলাহী তথা আল্লাহর গুণে মানুষকে গুণান্বিত করে তোলাই হচ্ছে সিয়ামের উদ্দেশ্য। সিয়াম মানুষকে ফেরেশতাদের অনুকরণের মাধ্যমে যতদূর সম্ভব নিজেকে প্রবৃত্তির গোলামী থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। কেননা ফেরেশতারা সবাই চাহিদা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং মানুষের মর্যাদাও হচ্ছে পশুর চেয়ে বহু ঊর্ধ্বে। জৈবিক চাহিদা মোকাবিলা করার জন্য তাকে দান করা হয়েছে বিবেক ও বুদ্ধির আলো। অবশ্য একদিক দিয়ে তার স্থান ফেরেশতাদের নিচে। জৈবিক চাহিদা ও পাশবিক কামনা অনেক সময় তার উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হয় এবং তার ভেতরের এ পশুত্ব দমন করতে তাকে কঠোর সাধনা করতে হয়। তাই মানুষ যখন পাশবিক ইচ্ছার সুতীব্র স্রোতে গাঁ ভাসিয়ে দেয়, তখন সে নেমে আসে অধঃপতনের নিম্নতম স্থানে। অরণ্যের পশু আর লোকালয়ের মানুষে কোনো প্রভেদ থাকে না তখন। আর যখন সে তার পাশবিকতা দমন করতে সক্ষম হয়, তখন তার স্থান হয় নূরের ফেরেশতাদেরও ওপরে।’ (এহয়াউল উলুম, খ-১, পৃ: ২১৬)

রোজা হচ্ছে ‘তাকওয়া’ অর্জনের সর্বোত্তম ট্রেনিংকোর্স। একজন মানুষ যতোবড় পাপিষ্ঠ কিংবা যেমনই হোক না কেনো রোজা রাখার পর তার অবস্থা এমন হয় যে, প্রচণ্ড গরমের দিনে পিপাসায় কাতর সে, একাকী কক্ষে, অন্য কেউ সাথে নেই, দরজা-জানালা বন্ধ, কক্ষে রয়েছে ফ্রিজ, ফ্রিজে রয়েছে শীতল পানি- এমনি মুহূর্তে তার তীব্র চাহিদা হচ্ছে, এ প্রচণ্ড গরমে এক ঢোক ঠাণ্ডা পানি পান করার। কিন্তু তবুও কি এ রোজাদার লোকটি ফ্রিজ থেকে শীতল পানি বের করে পান করে নিবে? না, কখনোই না। অথচ লোকটি যদি পান করে, জগতের কেউই জানবে না। তাকে কেউ অভিশাপ কিংবা গাল-মন্দও করবে না। জগৎবাসীর কাছে সে রোজাদার হিসেবেই গণ্য হবে। সন্ধ্যায় বের হয়ে সে লোকজনের সাথে ইফতারও করতে পারবে। কেউই জানবে না তার রোজা ভঙ্গের কথা। কিন্তু তারপরও সে ভাবে যে, অন্য কেউ না দেখলেও আমার মালিক যার জন্য রোজা রেখেছি তিনি তো আমায় দেখছেন। তাছাড়া আর কোনো কারণ নেই।

তাইতো আল্লাহ বলেন, ‘রোজা আমার জন্যই, সুতরাং আমিই এর প্রতিদান নিজ হাতেই দেব।’ আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়ার এবং জবাবদিহিতার ভয়ের অনুভূতি হৃদয়ে জাগ্রত হওয়াকেই বলে ‘তাকওয়া’। এজন্যই শাহ আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেছেন, ‘রোজার মাধ্যমে শুধুমাত্র পশুসুলভ চরিত্রের মৃত্যু ঘটবে এমন নয়, বরং বিশুদ্ধ রোজা মানেই তাকওয়ার উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সিঁড়ি।’

রোজার আরেকটি মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- আল্লাহ তা’আলার হুকুম পালন। এমনকি পুরো দীনের মূল কথাই হচ্ছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের হুকুম পালন করা। যখন বলবেন খাও তখন খাওয়াটাই ‘দীন’। যখন বলবেন খেও না- তখন না খাওয়াটাই ‘দীন’। আল্লাহ তা’আলার দাসত্ব স্বীকার আর আনুগত্যের এক বিস্ময়কর পদ্ধতি তিনি রোজার মাধ্যমে বান্দাকে দিয়েছেন। তিনি দিনব্যাপী রোজা রাখার হুকুম দিলেন, তার জন্য বহু সওয়াব বা প্রতিদান রাখলেন। অন্যদিকে সূর্যাস্তের সাথে সাথে তাঁর নির্দেশ- ‘তাড়াতাড়ি ইফতার করে নাও।’ ইফতার তাড়াতাড়ি করাটা আবার মুস্তাহাব হিসেবে আখ্যায়িত করলেন। বিনা কারণে ইফতারে বিলম্ব করাকে মাকরুহ হিসেবে আখ্যায়িত করলেন। কেন মাকরুহ? যেহেতু সূর্যাস্তের সাথে সাথে আল্লাহ তা’আলার হুকুম হচ্ছে ইফতার করে নেয়ার। যেহেতু এখন যদি না খাওয়া হয়, যদি ক্ষুধার্ত থাকা হয়, তবে এ ক্ষুধার্ত অবস্থা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় নয়। কারণ, সবকিছুর মৌলিক উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর আনুগত্য-দাসত্ব প্রকাশ করা, নিজ আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা নয়।

আবার সেহরির সময় বিলম্ব করে খাওয়া উত্তম। তাড়াতাড়ি খাওয়া সুন্নত পরিপন্থি। অনেকে রাত ১২টার সময় সেহরি খেয়ে শুয়ে পড়ে, এটা সুন্নতের পরিপন্থি। সাহাবায়ে কেরামের এ অভ্যাস ছিল যে, তাঁরা সেহরি শেষ সময় পর্যন্ত খেতেন। কারণ, সেহরি শেষ সময়ে খাওয়া শুধুমাত্র অনুমতিই নয়; বরং হুকুমও। আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য তো এরই মাঝে নিহিত।

তাই হাকিমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানভি (রহ.) বলেছেন, ‘যখনই আল্লাহ তা’আলা খাওয়ার নির্দেশ দেন, তখন বান্দা যদি বলে- খাবো না কিংবা বলে- আমি কম খাই, তাহলে এটা তো আনুগত্যের প্রকাশ হলো না। আরে ভাই! খাওয়ার আর না খাওয়ার মাঝে কিছু নেই। সব কিছুই হচ্ছে তাঁর আনুগত্যের মাঝে। অতএব, যখন তিনি বলেন- খাও, তখন খাওয়াটাই ইবাদাত। তখন না খেয়ে নিজের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত আনুগত্য প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই।’ (সূত্রঃ দেশ বিদেশ)

Related posts

বেনাচিতি হাই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের ত্রাণ বিলি

E Zero Point

করোনা মোকাবিলায় সঙ্কটকালীন মানবসম্পদ নিয়ে অনলাইন তথ্য ভান্ডারের সূচনা করলো সরকার

E Zero Point

লকডাউন ২.০ – যাত্রবাহী ট্রেন চলবে না ৩ মে পর্যন্তঃ ভারতীয় রেল

E Zero Point

মতামত দিন