অনু গল্প
মধুমিতার হিংসে নেই
স্বাতী মুখার্জী
কয়েকদিন হলো মধুমিতা একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে। সেটা হলো ওর হিংসে নেই। বরাবরই মধুমিতা হিংসে করে না কাউকে। কিন্তু সেই খবরটা ওর কাছে ছিলো না। এই কয়েক দিন হলো ও বুঝেছে।
বুঝলো কি করে? অনেকদিন ধরে ও বি সি এস পরীক্ষার প্রিপারেশন নিচ্ছে। পরীক্ষা দিচ্ছে। উতরোতে পারে না। কিছুদিন আগে ওর বন্ধু মহুয়া পাস করলো মেইনস। তাতে ও মনে মনে খুব খুশি হলো। লোপা বলছিলো “চ্যানেল আছে।” কথাই বন্ধ করে দিলো মহুয়ার সাথে। মধুমিতা বুঝলো মহুয়া হিংসুটে। যেটা মধু নিজে নয়।
মনে পড়লো স্কুলে কেউ ক্লাসে ওর থেকে বেশি নম্বর পেলে মনে মনে শুধু ভাবতো, “বেশ ভালো পড়াশোনা তে।” তাই বলে তাকে কোনো হিংসে টিংসে করা না। বরং অনেক বেশি কনসেনট্রেট করতো নিজের দিকে। নিজে কেমন করল, কোথায় ঘাটতি ইত্যাদি।
তাই বলে কি মধুর রাগ ক্ষোভ কিছুই হতো না? খুব হতো। রাগটা ওর সমবয়সীদের ওপর হতো না। হতো গুরুজনদের ওপর। মাস্টার মশাই, দিদিমণি, বাবা মা আত্মীয় স্বজন এদের ওপর। কারণটা সিম্পিল। তাঁরা যদি অন্য কারোর সঙ্গে মধুমিতার তুলনা করেছে, তাহলেই হয়েছে।
বড়পিসি একদিন ওদের বাড়িতে বেড়াতে এসে বলেছিলেন, ” হ্যাঁ রে মধু তোর কয় কাপ চা বানাতে এতক্ষণ লাগলো? ছোড়দার মেয়েকে দেখে এলাম কি কাজের হয়েছে!”
মধু মনে মনে বলেছিল,”কি করতে যে এরা বিজয়ার পর লোকের বাড়িতে আসে! টক্সিক একেবারে। বড়ো পিসির পাশে বসে গল্প করবে ভেবেছিলো, উঠে চলে গেছিল পাশের ঘরে।
তারপর নাচের ইস্কুলের হিন্দোলাদি? বাপরে বাপ। মধুমিতাকে অ্যানুয়াল প্রোগ্রামে নেওয়ারই কি দরকার হতো আজও মধু বোঝে না, আর যদি বা নাচে নিলোই, তো রাতদিন হৈমন্তীর সাথে তুলনা করার কি দরকার ছিলো? সব সময় বলতো, “হৈমন্তীকে দেখ। দেখ একবার। ঠিক একবার দেখালাম। তুলে নিলো। আমাকে অ্যাসিস্ট করার জন্যে ও ছাড়া আর কেউই নেই। আর তুই? গুনে দেখ এবার কতবার দেখাচ্ছি, ধরতেই পারছিস না। হৈমন্তীর এক্সপ্রেশানটা খেয়াল করবি এবার। ধার কাছ দিয়েও যায় না তোর এক্সপ্রেশান।” ফলটা কি হতো? মধুমিতা মনে মনে ঠিক করে নিতো একটা কিছু অজুহাতে পরেরবার থেকে কাটিয়ে দেবে নিজের নাম। নাচের স্কুলটা ছাড়ার কথা ভাবে নি অবশ্য। যতোই হোক বন্ধুদের সাথে এনজয় করার জন্য ছিলো সপ্তাহের ঐ একটা দিন।
এখন মধুমিতা সংসার করছে। কর্মক্ষেত্রে চুটিয়ে কাজও করছে। প্রাইভেট সেক্টর। টিঁকে থাকার লড়াইএ দক্ষতাই মাপকাঠি। তুলনা অবশ্য এখন আর হয় না।
এখন শুনতে হয় অন্যদের নির্জলা প্রশংসা। “চৌধুরীরা ভাগ্য করে ছেলের বৌ পেয়েছে বটে। ঘর সংসার দোকান বাজার সব সামলায় একা হাতে!!” ,,,,,,”রায়দের ছোটো ছেলের বৌএর সাথে দেখা হলো রাস্তায়। কাকীমা কাকীমা করে অস্থির।” তা মধুমিতার মাঝে মাঝে মনে হয়, আহারে! বেচারী শাশুড়ি মা। চৌধুরী, সাহা, রায় সবার ভাগ্য করে ভালো ভালো বৌমা পেলো, ওনারই ফাটা কপাল। মধুমিতার মতো ওঁচা একটা বৌমা জুটেছে। অফিসেও তাই। মধুর কলিগ আহেরী দক্ষতার সাথে কাজ করে। আহেরী প্রম্পট অ্যাকশান নিতে পারে সব কিছুতে। অতএব যত প্রশংসা আহেরীর। তাতে অবশ্য মধুমিতা চাপ লেস। মধুমিতার নাম আলাদা করে কেউ উল্লেখ করে না অতএব মধুমিতা বেশ ফ্রি। প্রশংসা নেই অতএব প্রশংসা হারানোর টেনশান নেই। ঐ আর কি। ‘মাথাই নেই তার মাথা ব্যথা!’ টাইপের ব্যাপার।। চাপ শূন্য হয়ে কাজ করে মধু। মাঝে মাঝে নিজেকে বড়োই ভাগ্যবতী ভাবে।
সেই ধারণা আরো বদ্ধমূল হলো সম্প্রতি শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণকে নিয়ে লেখা একটা বই পড়ে। মনের মধ্যে হিংসা না থাকা নাকি ঐশ্বরিক গুণ। সকলের থাকে না। বড় খুশি হলো মধুমিতা। ভগবান ওকে এই বৈশিষ্ট্য টা দিয়েছেন, আর কি চাই। এবার রাগ ক্ষোভটা কমিয়ে আনতে পারলেই হলো।
লোকে টাকা পয়সার হিসেব করে। মধুমিতা আজকাল ঐশ্বরিক গুণাগুণের হিসেব করতে শুরু করেছে।
একটা জীবন পার করতে পারলেই তো আর কেউ জানে না কে কোথায় চলে যাবে। মনটাই তাই সম্বৃদ্ধ হোক। ♥
