ভাবনা
কবিগুরুকে নিয়ে আমার ভাবনা
অসীমা সরকার
“দেশের কবি,দশের কবি,আমাদের রবিঠাকুর,
প্রাণের কবি,মনের কবি,আমাদের রবিঠাকুর।
আমার আঁখি তোমার লাগি,শান্তি যদি মেলে,
কবিগুরুর মন জুড়ানো কাব্যখানি পেলে।
গানের সাথে কবিতা-পাঠ,আর কবিতার সাথে গান,
কবিগুরু করেন তাঁহার হৃদয়খানি দান।
দেশের গর্ব কবিগুরু,শান্তির প্রতীক তুমি,
আমরা মানি শান্তিনিকেতন বিরাট পূণ্যভূমি।
সব কিছুর উর্দ্ধে থাকে তোমার লেখা ও গান,
তাই তো আজ বিশ্বখ্যাত আমাদের শান্তিনিকেতন।”
৭ই মে, ১৮৬১ সালে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে (অধুনা ‘ঠাকুরবাড়ি’) কবিগুরু জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং মাতা ছিলেন সারদাসুন্দরী দেবী। তিনি ছিলেন পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান।মাত্র আট বছর বয়স থেকে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। যদি আমরা মনের গভীরে একটু ঢোকার চেষ্টা করি, তাহলেই দেখতে পাবো,আমাদের মনমন্দিরের আসনটি দখল করে যিনি বসে আছেন, তিনি আর কেউ নন,আমাদের প্রিয় কবি,বাংলা কাব্যের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
বাংলা সাহিত্যের প্রায় সর্বত্রই তিনি ছিলেন ‘হীরক-খন্ড’।
“পেতেছি তোমার আসন,পেতেছি মনমন্দিরে,
আসন গ্রহণ করে হেথায়, ধন্য করো আমারে”।
পড়াশুনা করার থেকেও, লিখনে তাঁর আগ্রহ ছিলোঅনেক বেশি। প্রেম, আনন্দ, শোক, ভালোবাসা, ভালো
কবিগুরু ছুঁয়েছিলেন প্রান্তিক মানুষের মন। যাদের কাছে সময় নেই,কাব্য-রস নিয়ে চিন্তাভাবনা করবার। প্রতিদিন যাদের লড়াই চলে পেটকে শান্ত রাখার জন্যে। এখানেই কবির সার্থকতা। এই ক্ষমতাতেই তো তিনি সার্বজনীন। এখানেই শোভা পায় কবির কবিত্ব।
“সুন রবিঠাকুর–
তুয়ার পরতি মুরা জানাই পড়নাম।
তু তো সুব্বার কুবি।
তুর লিখাগুলান অত বুনঝিনারে–
প্যাটে তো তুদের মুত্ত বিদ্যাটো লাই।
কিন্তু সুকলের মুইখে মুইখে তুয়ার কথাটো সুইনি।
সত্যি ভাইল লাইগে।
তুয়ার কত্ত গুণ, কত্ত লোক তুয়াকে ভাইলবাসে।
পরতি বছর তুয়ার জনমদিনে কত্ত লোক আইসে
সব জায়গাগুলান থাইকা।
কৈলকাতা র থাইকা তুয়ার গানের,তুয়ার কবিতার শিল্পিগুলান আইসে।
মাইক ফুঁকাইয়া জানান দেয়।
প্যাটের খিদা ট চনচন কইরে।
মুরা তুয়ার গান শুনি।
তুই বেইচে থাইক। তুই বেইচে থাইক।”
কবির নিজের লেখাতেই আমরা পড়ি—
“মরিতে চাহিনা আমি এ সুন্দর ভুবনে, মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।”
১৯১৩ সালে ‘নোবেল পুরস্কারে’ ভূষিত কবি বন্দিত হলেন ‘বিশ্বকবি’–রূপে। সে জয় বিশ্বের দরবারে আমাদের মর্যাদা কে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। ১৯১৫ সালে বৃটিশ সরকারের দেওয়া “নাইট”–উপাধি তিনি ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ত্যাগ করেন। আমাদের আরও গৌরবের ব্যাপার হোলো কবিগুরু বাঙালি হয়েও,ইউরোপিয়ানদের বিচারে থিওডোররুজভেল্টের পরেই তিনি দ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব যিনি ‘নোবেল পুরস্কার’–পেয়েছিলেন।
কিন্তু মাথা নত করি লজ্জায় —
“কবিগুরুর ‘সোনার বাণী’–
মুগ্ধ করেছে বিশ্বকে,
পুরস্কারে ভূষিত হওয়া-
তোমার প্রিয় ‘নোবেল’ খানি,
কোথায় গেলো হারায়ে,
লজ্জায় ফেলেছে আমাদেরকে।
আজও লজ্জিত মোরা–
মাথা তোলার নেই সাহস,
কোথায় গেলো তোমার ‘নোবেল’,
নেই যে তার কোনো খোঁজ।
খোঁজার জন্যে এলো দল–
জানিনা কি খুঁজলো,
আরও বেশি খুঁজতে হবে–
পাঠককূল বললো।”
শান্তিনিকেতন–এর ‘বসন্ত উৎসব’–দোলের জন্যে বিখ্যাত। বহু দূর-দূরান্ত, দেশ-বিদেশের থেকে আসা প্রচুর জনসমাগমে তখন ‘শান্তিনিকেতন’–এ জায়গা পাওয়াই দুষ্কর হয়ে ওঠে।তার ফলে পুণ্যভূমিতে দেখা দেয় কিছুটা অস্থিরতা।
“সকল রঙের আবীর মেখে সেজে ওঠে পূণ্যভূমি,
মিষ্টি রঙের মিষ্টি খেলায় মেতে ওঠে পিতৃভূমি।
উশৃঙ্খল কিছু মানুষ করতে চায় কলুষিত,
বুঝিয়ে দিলে তাদের তুমি তোমরাও প্রভুর ভৃত্য।”
কবিগুরুকে নিয়ে যতই বলিনা কেনো, মন ভরে না। মনে হয় কিছু কম হোলো, কিছু বাকি রইলো।
১৯৪১ সালের ৭ই আগস্ট কবিগুরু ইহলোক ত্যাগ করে যাত্রা করেন পরলোকে। ভেঙে পড়ে তাঁর সকল শিষ্যের মন।
সব পূজায় দেবতাকে প্রণামের পর একটা রীতি আছে ‘পুষ্পাঞ্জলি’–দেবার।
তাই শ্রদ্ধা জানিয়ে আবার বলতেই হয় —
“তুমি মোদের প্রিয় কবি,প্রণমি তোমারে বারংবার –
কবির কখনও হয়না মৃত্যু,মানিনা মোরা মৃত্যু তোমার।
মানিনা বাইশ, মানিনা শ্রাবণ, দেহে যতদিন রবে প্রাণ,
চলবো তোমার করুনাধারায়,তোমার সুরস করিবো পান।
অমৃতলোকে থাকো তুমি, হয়ে চির-ভাস্বর,
আমরা সদাই গাহিবো তোমার প্রেমগাঁথা নিরন্তর।”♥

1 টি মন্তব্য
নববর্ষ সংখ্যার পর প্রকাশিত হয়েছে জিরো পয়েন্ট এর মাসিক জৈষ্ঠ্য সংখ্যা “রবীন্দ্র নজরুল সংখ্যা”।
লক ডাউন মাঝে মানুষ যখন গৃহবন্দি তখন রবীন্দ্র নজরুল কে স্মরণ করে জিরো পয়েন্ট এর এই প্রয়াস অতুলনীয়। এই মহান দুই মনীষী দের সম্মান জানানোর পাশাপাশি আমরা এই সংখ্যায় পেলাম অসাধারণ সব সাহিত্য বুনন।
বিশিষ্ট কবি ও বাচিক শিল্পী আরণ্যক বসুর কবিতা সমালোচনা করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। তাঁর কবিতা মানেই ‘spontaneous overflow of powerful feelings’। ”বৃন্তের দুটি ফুলে” কবিতাটিও ব্যতিক্রম নয়। রবীন্দ্র নজরুল এর পটভূমিকায় তিনি বলেছেন ‘সম্প্রীতি সম্প্রীতি রাখে শান্ত-নিরুদ্বেগ’ ।
শম্পা গাঙ্গুলি ঘোষ এর কবিতা “প্রণমি তোমারে” তে কবিমন রবীন্দ্রময় দৈনন্দিন জীবনের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দময় প্রকাশ’ ‘চিরস্থায়ী’ কবির ‘এ হৃদয় মাঝারে’। আঞ্জু মনোয়ারা আনসারী র কবিতা “প্রেম শাশ্বত” তে পাওয়ার অফ আর্ট এর কথা বলা হয়েছে। মানব জীবনের সমস্যাময় পথে বহু বাধা আসবেই। তবু কবির কাছে
‘চির শাশ্বত কবির অমৃত বাণী’ ‘জন্ম জন্মান্তরের তপস্যা ধন’। সৃষ্টি ও স্রষ্টা এই কবিতায় প্রেমময় ঈশ্বর।
তৃতীয় পৃষ্ঠায় শুভাশিস মল্লিক “রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল” শীর্ষক তথ্যপূর্ণ লেখনীতে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সম্পর্কে জানা যায়। বদ্রিনাথ পালের লেখা “এক বৃন্তের ফুল” এ অবিনশ্বর রবি-নজরুল কীর্তির জয়গান গেয়েছেন। ” তোমারই খোঁজে” কবিতায় দিকভ্রান্ত কবি ‘জীবনের জয়গান শোনে তোমার থানে বসে।’
কবিরুল এর ছোটগল্প “চন্ডালিকা” অসাধারণ। বর্তমান সময়ের পটভূমিকায় সমাজের নানান বিষয় খুব সুক্ষ চালে তুলে ধরেছেন তিনি। আজকের সমাজে মনিকার খুব দরকার। গল্প টি পড়তে পড়তে ডিলন টমাস এর “A Refusal to Mourn the Death” কবিতাটির কথা মনে পড়লো। আর এই গল্পের মাধ্যমে লেখক সমাজ সচেতনতার পাঠ দিতে ‘reverse psychology’ ব্যবহার করেছেন বলে মনে হয়।
“আহ্বানে কবি” তে কবি কেতকী মির্জার মননে বিদ্রোহী কবি নজরুলকে ফিরে আসার আর্তি ধরা পড়েছে: ‘ফিরে এসো গো কবি নজরুল/এসো এসো গো তরুন কবি নজরুল’। ডঃ রমলা মুখার্জি র প্রবন্ধ “পত্রিকা সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ” এর বিবরণ পাওয়া যায়। মিরাজুল সেখ “স্মরণে রবীন্দ্রনাথ” ও মুস্তারি বেগমের “অবেলার কবি” কবিতাদুটিতে চিরদার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জয়গান করেছেন।
বাংলা তথা বাঙালির ‘দমবন্ধ বাতাসে কালবৈশাখী’ হলেন কবিগুরু।
“কবিগুরু কে নিয়ে আমার ভাবনা” যে অসীমা সরকার কবিগুরু কে নিয়ে নানান ভাবনা তুলে ধরেছেন। ‘হিরকখন্ড’ উজ্জ্বল রবি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: “অমৃতলোকে থাকো তুমি, হয়ে চির-ভাস্বর,/আমরা সদাই গাহিবো তোমার প্রেমগাঁথা নিরন্তর।” হাস্নে আরা বেগম “চিরনমস্য” কবিতায় বর্তমান সময়ে নজরুল এর অভাব লক্ষ্য করেছেন। তিনি মনে করেন আজকে নজরুল থাকলে ‘বুঝতো সবাই বিদ্রোহ কাকে বলে?’
দেবপ্রিয়া বারিক এর “রঙের রবীন্দ্রনাথ ” এ চিত্রশিল্পী কবিগুরু কে পাওয়া গেলো এবং সঙ্গে বেশ কয়েকটি ছবি। রতন নস্করের “রবিঠাকুর রবিঠাকুর” ও মঞ্জুশ্রী মন্ডলের “বিদ্রোহী কবি” নামক কবিতা দুটিতে যথাক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলাম কে সম্মান জানিয়েছেন। “রবীন্দ্র সাহিত্য ও সমাজচেতনা” ই অগ্নিমিত্র রবীন্দ্র সমাজ ভাবনার দিকটি তুলে ধরেছেন। লক ডাউন এর সময় বন্দি জীবনে ‘তোমার (রবীন্দ্র)বাণী, তোমার (রবীন্দ্র) চিন্তায়/গানে গল্পে কবিতায়, দিন কেটে যায়’ বলেছেন কবি বর্ণালী শেঠ তার “আর্জি” কবিতায়। কবি শিলাবৃষ্টি র “সাম্যবাদী” কবিতায় বিদ্রোহী কবি “নজরুল ভারতের প্রতি প্রান্তরে তুমি চির-বিদ্রোহী বীর !” শেষ পাতায় স্থান পেয়েছে অসাধারণ আবৃতিমালা ও পাণ্ডুলিপির ছবি। সব মিলিয়ে খুব সুন্দর লাগলো জৈষ্ঠ্য ১৪২৭ সংখ্যা।
…রজত ঘোষ, বালিন্দর, কালনা, পূর্ব বর্ধমান।