গল্প
চণ্ডালিকা
রণজিৎ মল্লিক (কবিরুল)
” সংকোচের বিহ্বলতা …..
……. …….. ….. ম্রিয়মাণ
মূক্ত করো ভয়
আপনা মাঝে শক্তি ধর
নিজেরে করো জয়…….”
” সকাল থেকেই গান ধরেছিস। আর কতক্ষণ হারমোনিয়াম নিয়ে বসে থাকবি। এবার একটু মুখে কিছু দিয়ে নে। ” রান্না ঘর থেকে চৌধুরী বাড়ির বড় বৌ কথা গুলো বলল মণিকাকে।
” মা আর একটু রেওয়াজ করেনি। আর কদিন পরেই তো রবি ঠাকুরের জন্মদিন। অনুষ্ঠানের দুদিন আগে থেকে তেমন কোন সময় পাওয়া যাবে না। তাই এখন যতটুকু সময় পাওয়া যায় কাজ তুলে রাখছি ।”
” বেশ মা , তুই যা ভাল বুঝিস কর। তবে এই একটা বছর সাবধানে থাকতে হবে কিন্তু। দেখতেই তো পারছ চারিদিকে কেমন অতিমারি রাজত্ব করছে। আমার তো শুনে গা হাত পা ভয়ে কাঁপছে। তোর স্বামীটাকে ভগবান অকালে……. ” কথা শেষ না করেই শাড়ির খুঁট দিয়ে চৌধুরী গিন্নী চোখের জলটা মুছল।
” মা , আবার তুমি শুরু করলে। এখন আমাদের সকলকে মন চাঙ্গা করে এগোতে হবে। সামনে আরো লড়াই বাকি আছে। আমি জানি আমার স্বামী আর কোনদিন ফিরবে না। তবু আমার মতন সকলের যাতে এই বৈধব্য দশা না হয় , কেউ যাতে বেঘোরে প্রাণে মারা না যায় , সবাই যাতে সুস্থ থাকে , স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে তার জন্যে আমাদের সকলকে করণীয় যা যা বিধি তা পালন করতে হবে। দেখছ না খবরে , সংবাদ পত্রে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার কথা বলছে। আমরা যত সোস্যাল ডিসপ্যান্স মেনে চলব ততই আমাদের মঙ্গল। এই জন্যেই তো আমাদের এবারের রবীন্দ্র জয়ন্তীর থিম ” মুক্ত কর ভয় “। যার মাধ্যমে রবি ঠাকুরের কথায় , কবিতায় , গানে সকলকে সামাজিক বিধি , সামাজিক ব্যবধান মেনে চলার কথা আমরা বলব। আমাদের স্লোগান – ” মানতে হবে সামাজিক ব্যবধান , / এটাই এখন সরকারের বিধান । ” মণিকা বড় গিন্নীকে বেশ ভাল করে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে ছাড়ল।
পঁচিশে বৈশাখ যত কাছে আসছে , মণিকার গলার সুর তত চড়ছে। ওকে সেনাপতির মতন সব কিছু পর্যবেক্ষণ , তদারকি করতে হচ্ছে। ওর পাশে সবাই এগিয়ে এসেছে। খালপাড়ের কাছে একটা নিষিদ্ধ পল্লী আছে। সেখানকার দেহ পসারিণীরাও মণিকার কাজে এগিয়ে এসে যথেচ্ছভাবে পরিষেবা দিচ্ছে। ওদের নিয়ে মণিকা একটা নৃত্যনাট্য করতে চাই। যার নাম ” চণ্ডালিকা “।
হুগলীর পাণ্ডুয়ার মেয়ে মণিকা মালদার সামসির ছেলে আসাদকে ভালবেসে বিয়ে করেছিল। আসাদ ভিন্ন সম্প্রদায় বলে দুই পরিবারের তরফ থেকে অনেক বাধা আসে। তবু ওদের ভালবাসাতে ফাটল ধরেনি। ওদের দুজনের বিয়ে হয়েছিল। তবে মণিকাকে বিয়ে করার জন্যে আসাদকে গ্রাম ছাড়তে হয়। নিজের জেলা ছাড়তে হয়।
বিয়ের তিনমাস পরেই আসাদ চলে যায় দিল্লীত। ওখানে প্লাম্বিংয়ের কাজ করছিল। লক ডাউন জারি হতেই ওর মতন অনেকের কাজ চলে যায়। তারপর বাড়ি ফেরার জন্যে দিল্লীর কৈলাশনগরের কাছে বাস স্ট্যাণ্ডে দুদিন বাসের জন্যে অপেক্ষা করে। সেখান সামাজিক ব্যবধান মানা হয়নি। তাই ওর শরীরে কোন ভাবে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। কদিন আইসোলেশনে থাকার পর ও শরীরের অবনতি হতে শুরু করে। ও মারা যায়।
আসাদ মারা গেলেও মণিকা একদম ভেঙ্গে পড়েনি। কদিন একটু যদিও মন মরা ছিল। পরে গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে। নিজেই নিজের হিমগ্লোবিনকে চাঙ্গা রাখে।
মণিকা বুঝতে পেরেছে এ লড়াই জেতার একমাত্র অস্ত্র সচেতনতা। আর তা সামাজিক ব্যবধান বিধি মানার ফলেই সম্ভব হবে।
আসাদ তখন ব্যাণ্ডেলে একটা ফ্ল্যাট বিল্ডিংয়ে কাজ করত। মণিকা তখন একটা কোম্পানীর সেলসগার্ল। বাড়ি বাড়ি জ্যাম , জেলি , আচার এইসব বিক্রি করত।
সেদিনটাও ছিল কোন এক পঁচিশে বৈশাখ। আসাদ যে ফ্ল্যাট বিল্ডিংয়ে কাজ করত তার পাশের বিল্ডিংয়ে ” কবি প্রণাম ” এর আয়োজন করা হয়। সেখানে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আসাদ একটা রবি ঠাকুরের সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করে। মণিকা তখন ঐ বিল্ডিংয়ে জ্যাম , জেলি বিক্রি করতে এসেছিল।
আসাদের ” ভারত তীর্থ ” কবিতাটি মণিকা মন দিয়ে শোনে। কবিতাটি শুনে মণিকার বেশ ভাল লাগে। মণিকা নিজেও একটা সময় ভাল আবৃত্তি করত। তাই আবৃত্তিকারের সাথে দেখা করার ইচ্ছে প্রকাশ করে।
” আপনি তো বেশ ভাল আবৃত্তি করেন ? ” দেখা হতেই মণিকা আসাদকে প্রশ্ন করে।
” না মানে , এই একটু চেষ্টা করি। ” এই রকম এক অচেনা পরিবেশে এক সূন্দরী মহিলার কাছ থেকে এই রকম প্রশংসা বাক্য শুনে আসাদ খুশীতে গদ গদ হয়ে যায়। ওর চোখের কোণ চিক চিক করে ওঠে।
” চেষ্টা করি মানে ? আপনার কবিতা পাঠের ধরণ দেখে মনে হল আপনি রীতিমত তালিম নিয়েছেন কোথাও। “
আসাদ এবার পড়ল ফ্যাসাদে। চায়ে চুমুক দিয়ে বলল , আমি একটা বিল্ডংয়ে কাজের সূত্রে মগরার একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। সেই বাড়ির একটি ছেলে রোজ আবৃত্তি করত। ওর কাছেই হাতে খড়ি। ওই বাড়িতে বসে অনেক কবিতাও লিখেছি। “
” আপনি কবিতাও লেখেন ? আপনার মশাই অনেক ট্যালেন্ট আছে। আমাদের সামনেই নজরুল জয়ন্তীতে একটা অনুষ্ঠান আছে। সেই অনুষ্ঠানে আপনাকে কবিতা আবৃত্তি করতে হবে। আর নিজের লেখা কবিতা পাঠ করতে হবে। ” কথা গুলো বলেই মণিকা আসাদের জ্বলন্ত চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
সেই শুরূ। তারপর নিজেই আসাদের ঐ দু’চোখে ভালবাসা খুঁজে পায়।
আসাদ মণিকার কথা রেখেছিল। নজরুলের জন্মদিনে আসাদ কবিতা আবৃত্তি , নিজের কবিতা পাঠ করে শুনিয়ে ছিল।
আসাদ মারা গেলে মণিকা চৌধুরীবাড়িতে থাকতে শুরূ করে। বড় গিন্নীই ওর থাকার সব ব্যবস্থা করে দেয়। এই বাড়িতে ও থাকা খাওয়ার কাজ করে। এখানে ও নিজের রোজগারের টাকাতে পথের কূকুর , ভবঘুরে ভিক্ষিরিদেরকে রোজ সেবা দেয়। আজ রবিবার আজকে স্পেশাল মেনু।
দুপুরের পরেই মণিকা সব কাজ শেষ করে একটু ফ্রী হল।
প্রতিদিন দুপুরবেলাতে মণিকা আসাদের কবিতার ডায়েরীটা নিয়ে বসে। ওখান থেকে দু চারটে কবিতা নিজের মত করে পাঠ করে। নিজেও দু চার লাইন লেখার চেষ্টা করে। এই দুপুর বেলাতে মণিকা একটা ফ্রেশ অক্সিজেন পায়। ও মাঝে মাঝে ঘর বন্ধ করে আপন মনে আসাদের সাথে গল্প করে। ওকে গান শোনায়। আজ ও যেমন শোনাল।
একটু পরেই চৌধুরী বাড়িতে খাল পাড়ের মেয়েরাও চলে এসেছে। আজ এখানে আর এক প্রস্থ ” চণ্ডালিকা ” এর মহড়া হবে। সবাই তৈরী। মুখে মাস্ক পড়ে দূরত্ব বিধি মেনে দু চারজন বৌ পজিশন নিয়েছে। মোবাইলে ভেসে আসছে ” চণ্ডালিকার সংলাপ।
” ……. ……. ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না
ও যে চণ্ডালিক…….. ……… “
ভিক্ষুকবেশী মণিকা নৃত্যের তালে তালে সকলকে সচেতনার বার্তা দিচ্ছে। ওর চোখ টস টস করছে।
” …… ……. জল দাও
মোরে জল …….. “
রান্নাঘর থেকে চৌধুরী বাড়ির বড় গিন্নী গান আর নাচের তালে তালে হাতা খুন্তী নাড়ছেন।
আসাদ সব কিছুই উপর থেকে দেখল আর প্রাণভরে আশীর্বাদ করল।
চৌধুরী বাড়িতে আগাম পঁচিশে বৈশাখের সুর ভেসে আসল। ♥

1 টি মন্তব্য
নববর্ষ সংখ্যার পর প্রকাশিত হয়েছে জিরো পয়েন্ট এর মাসিক জৈষ্ঠ্য সংখ্যা “রবীন্দ্র নজরুল সংখ্যা”।
লক ডাউন মাঝে মানুষ যখন গৃহবন্দি তখন রবীন্দ্র নজরুল কে স্মরণ করে জিরো পয়েন্ট এর এই প্রয়াস অতুলনীয়। এই মহান দুই মনীষী দের সম্মান জানানোর পাশাপাশি আমরা এই সংখ্যায় পেলাম অসাধারণ সব সাহিত্য বুনন।
বিশিষ্ট কবি ও বাচিক শিল্পী আরণ্যক বসুর কবিতা সমালোচনা করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। তাঁর কবিতা মানেই ‘spontaneous overflow of powerful feelings’। ”বৃন্তের দুটি ফুলে” কবিতাটিও ব্যতিক্রম নয়। রবীন্দ্র নজরুল এর পটভূমিকায় তিনি বলেছেন ‘সম্প্রীতি সম্প্রীতি রাখে শান্ত-নিরুদ্বেগ’ ।
শম্পা গাঙ্গুলি ঘোষ এর কবিতা “প্রণমি তোমারে” তে কবিমন রবীন্দ্রময় দৈনন্দিন জীবনের কথা বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের ‘আনন্দময় প্রকাশ’ ‘চিরস্থায়ী’ কবির ‘এ হৃদয় মাঝারে’। আঞ্জু মনোয়ারা আনসারী র কবিতা “প্রেম শাশ্বত” তে পাওয়ার অফ আর্ট এর কথা বলা হয়েছে। মানব জীবনের সমস্যাময় পথে বহু বাধা আসবেই। তবু কবির কাছে
‘চির শাশ্বত কবির অমৃত বাণী’ ‘জন্ম জন্মান্তরের তপস্যা ধন’। সৃষ্টি ও স্রষ্টা এই কবিতায় প্রেমময় ঈশ্বর।
তৃতীয় পৃষ্ঠায় শুভাশিস মল্লিক “রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল” শীর্ষক তথ্যপূর্ণ লেখনীতে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক সম্পর্কে জানা যায়। বদ্রিনাথ পালের লেখা “এক বৃন্তের ফুল” এ অবিনশ্বর রবি-নজরুল কীর্তির জয়গান গেয়েছেন। ” তোমারই খোঁজে” কবিতায় দিকভ্রান্ত কবি ‘জীবনের জয়গান শোনে তোমার থানে বসে।’
কবিরুল এর ছোটগল্প “চন্ডালিকা” অসাধারণ। বর্তমান সময়ের পটভূমিকায় সমাজের নানান বিষয় খুব সুক্ষ চালে তুলে ধরেছেন তিনি। আজকের সমাজে মনিকার খুব দরকার। গল্প টি পড়তে পড়তে ডিলন টমাস এর “A Refusal to Mourn the Death” কবিতাটির কথা মনে পড়লো। আর এই গল্পের মাধ্যমে লেখক সমাজ সচেতনতার পাঠ দিতে ‘reverse psychology’ ব্যবহার করেছেন বলে মনে হয়।
“আহ্বানে কবি” তে কবি কেতকী মির্জার মননে বিদ্রোহী কবি নজরুলকে ফিরে আসার আর্তি ধরা পড়েছে: ‘ফিরে এসো গো কবি নজরুল/এসো এসো গো তরুন কবি নজরুল’। ডঃ রমলা মুখার্জি র প্রবন্ধ “পত্রিকা সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ” এর বিবরণ পাওয়া যায়। মিরাজুল সেখ “স্মরণে রবীন্দ্রনাথ” ও মুস্তারি বেগমের “অবেলার কবি” কবিতাদুটিতে চিরদার্শনিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জয়গান করেছেন।
বাংলা তথা বাঙালির ‘দমবন্ধ বাতাসে কালবৈশাখী’ হলেন কবিগুরু।
“কবিগুরু কে নিয়ে আমার ভাবনা” যে অসীমা সরকার কবিগুরু কে নিয়ে নানান ভাবনা তুলে ধরেছেন। ‘হিরকখন্ড’ উজ্জ্বল রবি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন: “অমৃতলোকে থাকো তুমি, হয়ে চির-ভাস্বর,/আমরা সদাই গাহিবো তোমার প্রেমগাঁথা নিরন্তর।” হাস্নে আরা বেগম “চিরনমস্য” কবিতায় বর্তমান সময়ে নজরুল এর অভাব লক্ষ্য করেছেন। তিনি মনে করেন আজকে নজরুল থাকলে ‘বুঝতো সবাই বিদ্রোহ কাকে বলে?’
দেবপ্রিয়া বারিক এর “রঙের রবীন্দ্রনাথ ” এ চিত্রশিল্পী কবিগুরু কে পাওয়া গেলো এবং সঙ্গে বেশ কয়েকটি ছবি। রতন নস্করের “রবিঠাকুর রবিঠাকুর” ও মঞ্জুশ্রী মন্ডলের “বিদ্রোহী কবি” নামক কবিতা দুটিতে যথাক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলাম কে সম্মান জানিয়েছেন। “রবীন্দ্র সাহিত্য ও সমাজচেতনা” ই অগ্নিমিত্র রবীন্দ্র সমাজ ভাবনার দিকটি তুলে ধরেছেন। লক ডাউন এর সময় বন্দি জীবনে ‘তোমার (রবীন্দ্র)বাণী, তোমার (রবীন্দ্র) চিন্তায়/গানে গল্পে কবিতায়, দিন কেটে যায়’ বলেছেন কবি বর্ণালী শেঠ তার “আর্জি” কবিতায়। কবি শিলাবৃষ্টি র “সাম্যবাদী” কবিতায় বিদ্রোহী কবি “নজরুল ভারতের প্রতি প্রান্তরে তুমি চির-বিদ্রোহী বীর !” শেষ পাতায় স্থান পেয়েছে অসাধারণ আবৃতিমালা ও পাণ্ডুলিপির ছবি। সব মিলিয়ে খুব সুন্দর লাগলো জৈষ্ঠ্য ১৪২৭ সংখ্যা।
…রজত ঘোষ, বালিন্দর, কালনা, পূর্ব বর্ধমান।